সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে দুই বাংলাদেশিসহ তিন জনের মৃত্যু

বেনার নিউজ:

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে শুক্রবার ভোরে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে অন্তত দু’জন বাংলাদেশি এবং একজন ভারতীয় নিহত হয়েছেন। নিহতরা গরু পাচারের সঙ্গে জড়িত ছিল বলে এক বিবৃতিতে দাবি করেছে বিএসএফ।

ভারত ও বাংলাদেশ পর্যায়ের সব বৈঠকে বিএসএফের পক্ষ থেকে সীমান্তে হত্যার ঘটনাকে শূন্যে নামিয়ে আনা এবং গুলি না চালানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও এভাবে মৃত্যুর ঘটনা দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেছেন মানবাধিকার সংগঠন বাংলার মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চের(মাসুম) সম্পাদক কিরীটি রায়।

বাংলাদেশের মানবাধিকার সংগঠন আইন ও শালিস কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, গত ১১ মাসে সীমান্তে অন্তত ১৩ জন বাংলাদেশি মারা গেছেন।

নিহতরা গরু পাচারকারী: ভারতীয় পুলিশ

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কোচবিহারের সিতাই থানা এবং বাংলাদেশের লালমনিরহাট জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার গোড়ল ইউনিয়ন সংলগ্ন সীমান্ত এলাকায় ওই ঘটনা ঘটে।

কোচবিহারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কুমার সানি রাজ শুক্রবার দুপুরে সাংবাদিকদের বলেন, ‘‘বিএসএফের গুলিতে তিন জন মারা গেছে। শুক্রবার ভোর তিনটা নাগাদ কয়েক জনকে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে গরু পাচার করতে দেখে বিএসএফের জওয়ানরা। চ্যালেঞ্জ জানানো হলে পাচারকারীরা তাঁদের আক্রমণ করার চেষ্টা করে।”

“বিএসএফ গুলি চালালে ঘটনাস্থলে দুই জন পাচারকারী মারা যান। তাঁদের পরিচয় জানা যায়নি,” যোগ করেন তিনি।

“গুলিবিদ্ধ অবস্থায় সীমান্তের বাংলাদেশের দিকে দুটি এবং ভারতীয় অংশে একটি মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, তিনজনই গরু পাচারের এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ছিল,” পুলিশ সুপার বলেন।

শুক্রবার এক বিবৃতিতে বিএসএফ জানায়, তারা প্রথমে রাবার বুলেটের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে। তবে শেষ পর্যন্ত পাচারকারীদের আক্রমণের মুখে আত্মরক্ষার্থে গুলি চালায়।

তবে দুই বাংলাদেশি হত্যার বিষয়টি শুক্রবার নিশ্চিত করেনি বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী- বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ(বিজিবি)।

বিজিবির পরিচালক (অপারেশন) লে. কর্নেল ফয়জুর রহমান বেনারকে বলেন, “সীমান্তে দুজন গুলিবিদ্ধ হওয়ার আমরা শুনেছি। তারা বাংলাদেশি কি না সে বিষয়ে আমরা নিশ্চিত হতে পারিনি।”

যদিও লালমনিরহাটের গোড়ল ইউনিয়ন চেয়ারম্যান মাহমুদুল ইসলাম বেনারকে জানান, নিহতরা বাংলাদেশি। নিহতরাসহ কয়েকজন সীমান্তে ভারতীয় গরু পারাপার করতে গেলে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর টহল দল তাঁদের লক্ষ্য করে গুলি করে। এসময় দুজন মারা যান ও কয়েকজন আহত হন।

হত্যাকাণ্ডের পরে বিএসএফ নিহত দুই জনের লাশ নিয়ে গেছে বলে জানান মাহমুদুল ইসলাম।

নিহত বাংলাদেশিরা হলেন; কালীগঞ্জ উপজেলার গোড়ল ইউনিয়নের বাসিন্দা মোসলেম উদ্দিনের ছেলে ইদ্রিস আলী (৪৪) ও মৃত আলতাফ হোসেনের ছেলে মো ভাসানী (৪৫)। নিহত ভারতীয় নাগরিকের নাম প্রকাশ বর্মণ(৩৫)। তিনি কোচবিহারের সিতাইয়ের সাতভান্ডারির বাসিন্দা।

১১ মাসে ১৩ হত্যা

আইন ও শালিস কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সীমান্তে ১১টি হত্যাকাণ্ড ঘটে। এর সঙ্গে শুক্রবার যুক্ত হয়েছে আরও দুজন।

এদের মধ্যে ১১ জনকে গুলি করে এবং একজন নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হয়। এছাড়া একই সময়ে ছয়জন বাংলাদেশি আহত হন বলে জানায় আসক।

সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে ২৬০ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত বছর সবচেয়ে বেশি ৪৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। তার আগের বছর মৃত্যু হয়েছে ৪৩ জনের।

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ৪০৯৬ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে রয়েছে ২২১৭ কিলোমিটার সীমান্ত।

প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও গুলি চলে

গত বছরে ঢাকায় অনুষ্ঠিত চারদিনের মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠক শেষে বিএসএফের মহাপরিচালক রাকেশ আস্তানা সীমান্তে মৃত্যুর ঘটনা শূন্যে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি বলেন, বিএসএফ প্রথমে রবার বুলেট (নন লিথাল) ব্যবহার করে। তবে শেষ অস্ত্র হিসেবে আত্মরক্ষার্থে তারা গুলি (লিথাল) চালাতে বাধ্য হয়।

মানবাধিকার সংগঠন বাংলার মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চের(মাসুম) সম্পাদক কিরীটি রায় প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে সীমান্তে বিএসএফের হাতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটতে থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

বাংলাদেশের মানবাধিকার কর্মী ও আসকের জ্যেষ্ঠ উপপরিচালক নীনা গোস্বামী বেনারকে বলেন, “দুই প্রতিবেশী দেশের সীমান্তে গুলি করে মানুষ হত্যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু সংশ্লিষ্ট দেশ এসব হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনছে না। ফলে সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হচ্ছে না।”

সীমান্ত হত্যা: বিজেপি-তৃণমূল বিতর্ক

সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে কেন্দ্রের শাসক দল ভারতীয় জনতা পার্টির মধ্যে বিতর্ক শুরু হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের সিতাইয়ের বিধায়ক জগদীশ বর্মণ বসুনিয়া বেনারকে বলেন, “সিতাইয়ের ঘটনা বিএসএফের এখতিয়ার বাড়ানোরই পরিণতি।”

“বিএসএফের তো রবার বুলেট প্রয়োগ করার কথা। কিন্তু তারা গুলি চালাল কেন?,” প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।

তবে সিতাইয়ের মৃত্যুর ঘটনার জন্য বিএসএফকে দায়ী করে কোচবিহারের দিনহাটার বিধায়ক উদয়ন গুহ সাংবাদিকদের বলেন, “সীমান্তে চোরাচালানের সঙ্গে বিএসএফের লোকজনই যুক্ত। অথচ প্রতিবারই ঘটনার পর বিস্তারিত গল্প শোনানো হয়।”

অবশ্য ভারতীয় জনতা পার্টির রাজ্য সাধারণ সম্পাদক সায়ন্তন বসু মনে করেন, “সিতাইয়ে গুলি চালিয়ে বিএসএফ সঠিক কাজই করেছে।”

“অনুপ্রবেশ ও চোরাচালান ঠেকাতে এবং সীমান্ত রক্ষায় তাদের গুলি চালানোর অধিকার রয়েছে,” বেনারকে বলেন তিনি।

সীমান্তে বিএসএফের এখতিয়ার বাড়ানো নিয়ে বিতর্ক

সীমান্তের অভ্যন্তরে বিএসএফের কাজের এখতিয়ার বৃদ্ধি নিয়ে বিতর্ক এবং সিতাইয়ে গুলি চালানোর ঘটনার মধ্যেই শুক্রবার পশ্চিমবঙ্গের স্বরাষ্ট্র ও মুখ্য সচিবের সঙ্গে সীমান্তের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনার জন্য কলকাতায় শুক্রবার এক বৈঠকে বসেন ভারতের স্বরাষ্ট্র সচিব অজয় ভাল্লা।

রাজ্যের শাসক দলের নেতা পার্থ চট্টোপাধ্যায় জানান, রাজ্য বিধানসভায় বিএসএফের এখতিয়ার বাড়ানোর প্রতিবাদ জানিয়ে একটি প্রস্তাব পাশ করানো হবে।

পশ্চিমবঙ্গ, পাঞ্জাব ও আসামে বিএসএফের কাজ করার এখতিয়ার সীমান্তের শূন্য রেখা থেকে বাড়িয়ে অভ্যন্তরে ৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত করে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক গত মাসে নির্দেশনা জারি করে। আগে বিএসএফের এখতিয়ার ছিল ১৫ কিলোমিটার।

এর প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই নির্দেশ বাতিল করার দাবি জানিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারকে চিঠিও দিয়েছেন।

গত ২৫ অক্টোবর এক প্রশাসনিক বৈঠকে মমতা বলেন, বিএসএফের এখতিয়ার বাড়ানোর উদ্দেশ্য হল দেশের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোতে সরাসরি হস্তক্ষেপ।

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry
Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *