সাত মাস বিরতির পর ভাসানচরে আবার রোহিঙ্গা স্থানান্তর শুরু

বেনার নিউজ:

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ও সরকারের মধ্যে ভাসানচরে শরণার্থী ব্যবস্থাপনা বিষয়ক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) হওয়ার পর প্রথমবারের মতো সেখানে রোহিঙ্গাদের নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। প্রায় সাত মাস বন্ধ থাকার পর বুধবার কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রাম হয়ে ভাসানচরের উদ্দেশ্যে রওনা করবেন দেড় হাজারের বেশি রোহিঙ্গা।

“ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের এই স্থানান্তর প্রক্রিয়ায় ইউএনএইচসিআর যুক্ত রয়েছে,” বলে মঙ্গলবার বেনারকে জানান সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ সচিব মো. মহসিন।

ভাসানচরে অবস্থান করা অতিরিক্ত শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসাইন বেনারকে জানান, “স্থানান্তর প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করছেন ইউএনএইচসিআর-এর কর্মকর্তারা।”

তবে বাংলাদেশে ইউএনএইচসিআর-এর মুখপাত্র মঙ্গলবার ই-মেইলে পাঠানো বেনারের এ বিষয়ক প্রশ্নের জবাব দেননি।

“কক্সবাজারে আশ্রিতদের মধ্যে স্বেচ্ছায় আসতে ইচ্ছুক নতুন রোহিঙ্গা দলটি বৃহস্পতিবার দুপুরে ভাসানচরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে,” মুঠোফোনে মঙ্গলবার বেনারকে জানান ভাসানচরে আরআরআরসি প্রতিনিধি ও ক্যাম্প-ইন-চার্জ (সিআইসি) নওশের ইবনে হালিম।

দেড় হাজারের বেশি রোহিঙ্গা আসার কথা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি জানান, “সংখ্যাটা কম-বেশি হতে পারে। তবে ভাসানচরে আমরা সেভাবেই প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি।”

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবির থেকে মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত এক লাখ নাগরিককে নোয়াখালীর হাতিয়ার অবস্থিত ভাসানচরে নেওয়ার লক্ষ্য ঠিক করেছে সরকার। এর আগে ছয় দফায় প্রায় ১৯ হাজার রোহিঙ্গাকে সেখানে নেওয়া হয়, এবার সপ্তম দফায় নেওয়া হচ্ছে তাঁদের।

ইউএনএইচসিআর-এর সহযোগিতায় এক বছরের মধ্যে এক লাখ রোহিঙ্গাকে কক্সবাজার থেকে ভাসানচরে স্থানান্তরের লক্ষ্য পূরণে বাংলাদেশ সক্ষম হবে বলে গত শনিবার সাংবাদিকদের জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন।

স্থানান্তর বন্ধ রাখার দাবি

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে বলেছে, “চলাচলের স্বাধীনতা ও অন্যান্য অধিকার সুরক্ষিত না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের উচিত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ভাসানচর দ্বীপে স্থানান্তর বন্ধ রাখা।”

সাম্প্রতিক এই স্থানান্তরের উদ্যোগে সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং ইউএনএইচসিআর-এর সঙ্গে গত ৯ অক্টোবর সাক্ষর হওয়া ‘এমওইউ’ লঙ্ঘিত হবে বলেও দাবি করেছে মানবাধিকার সংস্থাটি।

নিউইয়র্ক থেকে নিজস্ব সাইটে এইচআরডব্লিউ জানিয়েছে, ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের ইউএনএইচসিআর যাতে পূর্ণ সমর্থন ও সুরক্ষা দিতে পারে তা সরকারের নিশ্চিত করা উচিত। জাতিসংঘের এই সংস্থাটি যতক্ষণ একটি গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়া তৈরি না করছে, ততক্ষণ স্থানান্তর বন্ধ রাখার পক্ষে মত দেয় মার্কিন মানবাধিকার সংস্থাটি।

সংস্থার শরণার্থী ও অভিবাসী অধিকার বিষয়ক পরিচালক বিল ফ্রেলিক বলেন, “জাতিসংঘের সাথে বাংলাদেশের ‘অক্টোবর চুক্তি’ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জোর করে ভাসানচরে স্থানান্তরের ‘ফ্রি-টিকিট’ দিয়ে দেয়নি।”

ভাসানচরকে দুর্গম, বন্যাপ্রবণ উল্লেখ করে বিল ফ্রেলিক দাবি করেন, “দ্বীপটি কার্যত একটি কারাগার।”

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

অভিবাসন ও শরণার্থী বিষয়ক বিশ্লেষক আসিফ মুনীরের মতে, এর আগে ভাসানচর থেকে পালাতে গিয়ে ট্রলার ডুবে রোহিঙ্গাদের মারা যাওয়া বা চরে জাতিসংঘের কর্মকর্তাদের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শনের মতো ঘটনা ঘটেছে বলেই এইচআরডব্লিউ এসব কথা বলতে পারছে।

জাতিসংঘের সংশ্লিষ্টতা না থাকায় স্থানান্তর প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে বারবারই প্রশ্ন উঠেছে উল্লেখ করে তিনি বেনারকে বলেন, “এবারও সবাই সবকিছু জেনেঝুঝে স্বেচ্ছায় ভাসানচরে যাচ্ছে কিনা তা খুব পরিষ্কার নয়।”

“ইউএন-এর সংস্থাগুলো সেখানে ত্রাণ বা অন্যান্য মানবিক সহায়তা দেবে। এর বাইরের কোনো প্রক্রিয়ার মধ্যে তারা এখনো জড়িত নয়। আপাতত সরকারও তাদের সেভাবে জড়াতে চাচ্ছে না। নিজেদের মতো করে তারা বিষয়টা সামলাচ্ছে,” বলেন আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) সাবেক এই কর্মকর্তা।

সরকার এবং ইউএনএইচসিআর-এর মধ্যে সাক্ষরিত ‘এমওইউ’-তে বলা হয়েছিল, যে কোনো সময় চুক্তিটি বাস্তবায়ন করা যাবে। চুক্তিটি হওয়ায় ১২ অক্টোবর কুতুপালং মেগা ক্যাম্পের বিভিন্ন স্থানে আনন্দ মিছিল ও মিষ্টি বিতরণ করেছিল রোহিঙ্গারা।

নভেম্বরের শুরুতে দ্বীপটি দেখে আসে ইউএনএইচসিআর এবং বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) যৌথ প্রতিনিধি দল। এরই ধারাবাহিকতায় ১৭ নভেম্বর জাতিসংঘের ত্রাণ সহায়তার ১৩৭ দশমিক ২৮ টন মালামাল নিয়ে নৌবাহিনীর দুটি জাহাজ ভাসানচরে পৌঁছায়।

মিয়ানমারের রোহিঙ্গাসহ অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানবাধিকার পরিস্থিতি বিষয়ে জাতিসংঘে প্রথমবারের মতো সর্বসম্মত প্রস্তাব গৃহীত হওয়ায় ১৮ নভেম্বর ঢাকায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেন, রাশিয়া-চীনও এখন রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান করতে চায়।

ক্যাম্প ছেড়েছে রোহিঙ্গারা

আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (৮-এপিবিএন) অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. কামরান হোসেন বেনারকে জানান, “সোমবার থেকেই রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন ক্যাম্প থেকে এনে উখিয়া ডিগ্রি কলেজ মাঠে জড়ো করা হয়েছে। এ দফায় দেড় থেকে দুই হাজার রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে নেওয়ার ‘টার্গেট’ রয়েছে।”

শরণার্থীরা বুধবার সকালে কক্সবাজার ছেড়ে গিয়ে রাতে চট্টগ্রাম থাকবেন জানিয়ে তিনি বলেন, “সেখান থেকে বৃহস্পতিবার সকালে নৌ-বাহিনীর তত্ত্বাবধানে তাদের ভাসানচর নিয়ে যাওয়া হবে।”

রোহিঙ্গা নেতারা বেনারকে জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সহিংস ঘটনার কারণে আতঙ্কিত উখিয়ার কুতুপালং মেগাক্যাম্পের লম্বাশিয়া, বালুখালীসহ বিভিন্ন শিবিরের অনেকে ভাসানচরে যেতে রাজি হয়েছে, যারা আগে সেখানে যেতে চায়নি।

“আমার শিবিরের পাঁচটি পরিবারের ২৮ জনের একটি একটি দল স্বেচ্ছায় ভাসানচর যাওয়ার লক্ষ্যে ক্যাম্প ছেড়েছে,” বেনারকে বলেন লম্বাশিয়া শিবিরের রোহিঙ্গা নেত্রী জামালিদা বেগম।

উখিয়ার কুতুপালং মেগাক্যাম্পের লম্বাশিয়া শিবিরে আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের (এআরএসপিএইচ) কার্যালয়ে ২৯ সেপ্টেম্বর মুহিব উল্লাহকে এবং ২২ অক্টোবর বালুখালীর ‘দারুল উলুম নাদওয়াতুল ওলামা আল-ইসলামিয়াহ’ মাদ্রাসায় আরো ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় ক্যাম্পের বাসিন্দারা ভয়-ভীতির মধ্য রয়েছে উল্লেখ করে জামালিদা বলেন, “মূলত এ কারণেই নতুন করে অনেক রোহিঙ্গা ভাসানচরে যেতে চাচ্ছে।”

এছাড়া ভাসানচর কার্যক্রমের সঙ্গে “জাতিসংঘ যুক্ত হওয়ার খবরে এবার অনেক রোহিঙ্গা সেখানে যেতে উৎসাহিত হয়েছে,” বলে বেনারকে জানান কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের চেয়ারম্যান মো. রফিক।

গত বছরের ডিসেম্বর থেকে ছয় দফায় ১৮ হাজার ৯৫ জন রোহিঙ্গাকে সরকার ভাসানচরে পাঠায়। এ ছাড়া গত বছর মে মাসে অবৈধভাবে মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টা করা ৩০৬ রোহিঙ্গাকে সমুদ্র থেকে উদ্ধার করে সেখানে নিয়ে রাখা হয়।

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry
Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *