সমালোচনার মুখে বাতিল ৭৫ বছরের পুরানো নিয়ম: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হলে থাকতে পারবেন বিবাহিত ছাত্রীরা

বেনার নিউজ:

ছাত্রী ও অধিকার কর্মীদের তীব্র সমালোচনার মুখে প্রায় ৭৫ বছরের পুরানো নিয়ম স্থগিত করে বিবাহিতা ও গর্ভবতী ছাত্রীদের আবাসিক হলে অবস্থানের অনুমতি দিচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

বুধবার রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভোস্ট স্ট্যান্ডিং কমিটির সভায় এই সিদ্ধান্তের বিষয়টি বেনারকে নিশ্চিত করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ড. মুহাম্মদ সামাদ।

পঞ্চাশের দশকে ছাত্রীদের আবাসিক হল প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর থেকেই বিবাহিতা এবং গর্ভবতী ছাত্রীদের আবাসিক হলে অবস্থান নিষিদ্ধ করে আসছে বিশ্ববিদ্যালয়ের হল কর্তৃপক্ষ। সম্প্রতি এক বিবাহিত ছাত্রীর হলে অবস্থানের বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এলে এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। এতদিন কোনোরকম ঘোষণা ছাড়াই বিবাহিত ছাত্রীদের কেউ কেউ হলে থাকতেন। এ নিয়ে হল প্রশাসন তেমন আপত্তি তোলেনি।

তবে বিবাহিত ওই ছাত্রীর হলে থাকার বিষয়টি নিয়ে হল প্রশাসনের আপত্তির কথা গত কয়েকদিন ধরে নানাভাবে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ হতে থাকে।

বুধবার বিবাহিতা ছাত্রীদের হলে থাকার নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে উকিল নোটিশ পাঠান এক আইনজীবী।

বুধবার রাতেই এ বিষয়ে জরুরি সভা ডাকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সভার সিদ্ধান্ত সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ড. মুহাম্মদ সামাদ বেনারকে বলেন, “আজকের সভায় বিতর্কিত সেই বিধানটি রহিত করা হলো। বিবাহিতা ছাত্রীরা হলে থাকতে পারবে না, গর্ভবতী ছাত্রীরা হলে থাকতে পারবে না—এই বিধানগুলো আর থাকবে না।”

তিনি বলেন, “আজকের সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে এগুলো সিন্ডিকেট সভায় অনুমোদন নিতে হবে। আশা করি এ মাসের মধ্যেই সিন্ডিকেট সভা অনুষ্ঠিত হবে এবং সেখানেই বিধানটি চূড়ান্তভাবে রহিত করা হবে।”

“বিবাহিতা ছাত্রীরা হলে থাকতে পারবে না-এই বিধানটি কবে থেকে চালু করা হয়েছে সেটি সুনির্দিষ্টভাবে বলা কঠিন,” জানিয়ে ড. সামাদ বলেন, “এটি ছাত্রী হল প্রতিষ্ঠার পর থেকেই চলে আসছে। তবে বিবাহিত ছাত্রদের হলে অবস্থানের ব্যাপারে কোনো বিধিনিষেধ কখনও ছিল না।”

তবে ছাত্রী হলে স্থান সংকটের কারণে অনেক ক্ষেত্রে একেকটি সিটে দুজন করে ছাত্রী থাকেন জানিয়ে উপ-উপাচার্য সামাদ বলেন, এরকম ক্ষেত্রে “একটি সংকীর্ণ খাটে একজন গর্ভবতী আরেকজনের সাথে থাকলে সমস্যা হতে পারে।”

“বর্তমানে আমাদের সিদ্ধান্ত হলো, ইচ্ছা করলে গর্ভবতী ছাত্রীরা হলে থাকতে পারবেন। তবে তাঁদের এবং শিশুর যত্নের কথা চিন্তা করে আমরা চাইব তাঁরা যেন তাঁদের পিতামাতার কাছে থাকেন,” বলেন মুহাম্মদ সামাদ।

তিনি জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে কমপক্ষে ৩৮ হাজার শিক্ষার্থী রয়েছেন এবং ছাত্র-ছাত্রীর অনুপাত প্রায় শতকরা ৬৫:৩৫। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের জন্য পাঁচটি আবাসিক হলে মোট আসন সংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজার ৭০০, তবে এই আসনের বিপরীতে প্রায় তিনগুণ ছাত্রী অবস্থান করেন বলে জানান তিনি।

আবাসিক সংকটের সুরাহা দরকার

বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন সিদ্ধান্তে খুশি আন্দোলনরত শিক্ষার্থী এবং অধিকারকর্মীরা।

শামসুন্নাহার হলের সাবেক ভিপি শেখ তাসনিম আফরোজ ইমি বেনারকে বলেন, “আমরা শামসুন্নাহার হল ছাত্রী সংসদের যে পাঁচজন সদস্য ছিলাম সবাই এই বিধানটি রহিত করার জন্য আমাদের প্রভোস্টকে অনুরোধ করলে তিনি জানান, হলে সিট সংকটের কারণে বিবাহিতা ছাত্রীদের হলে সিট দেয়া হয় না।”

তিনি বলেন, “প্রভোস্ট ম্যাডাম আমাদের জানান, যদি একজন বিবাহিতা ছাত্রীর স্বামী ঢাকায় থাকেন এবং তিনি যদি আসনটি ছেড়ে দেন তবে সেখানে আরেকজন ছাত্রী সেখানে থাকতে পারেন। আমরা এই যুক্তিতে কোন প্রতিবাদ করিনি।”

তিনি জানান, সাম্প্রতিক সময়ে কুয়েত-মৈত্রী হলের একজন বিবাহিতা ছাত্রীর সিট বাতিল করা হয় এবং “তাঁর সাথে খারাপ আচরণ করে হল কর্তৃপক্ষ।” এ ছাড়া, শামসুন্নাহর হলেও প্রথম বর্ষের এক ছাত্রীকে বলা হয়, তাঁকে তখনই সিট দেয়া হবে যখন একজন বিবাহিতা ছাত্রী সিটটি ছাড়বেন।

“আমরা বিষয়গুলো নিয়ে হল কর্তৃপক্ষের কাছে গেলে তাঁরা বলেন, বিবাহিতা ছাত্রীদের আসন দিতে গেলে নিয়ম পরিবর্তন করতে হবে। তারপর থেকেই আমরা এই বৈষম্যমূলক নিয়ম বাতিলের দাবি জানিয়ে সাংবাদিক সম্মেলন করি,” বলেন ইমি।

শামসুন্নাহার হলে মোট আসন সংখ্যা আটশোর মতো। তবে সেখানে প্রায় দুই হাজার ৩০০ ছাত্রী অবস্থান করেন জানিয়ে ইমি বলেন, “এভাবে গাদাগাদি করে অবস্থানের কারণে কোনো ছাত্রীর ব্যক্তিগত কিছুই রক্ষা করা যায় না। এর একটি সুরাহা হওয়া দরকার।”

এর আগে মঙ্গলবার বিবাহিতা ছাত্রীদের হল ত্যাগের নির্দেশ প্রত্যাহার করে টাঙ্গাইলে অবস্থিত মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। সেখানেও এই বিষয়টি নিয়ে অস্থিরতা চলছিল। তবে দেশের অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এমন নিয়ম থাকার কথা জানা যায়নি।

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry
Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *