লঞ্চে আগুন: সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্বে অবহেলা পেয়েছে মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি

বেনার নিউজ:

ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে অভিযান-১০ লঞ্চে অগ্নিকাণ্ডে হতাহতের ঘটনায় নৌ পরিবহন অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনে চরম অবহেলা পেয়েছে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি।

পাশাপাশি লঞ্চটির চারজন মালিক, মাস্টার ও চালকদের দায়ী করা হয়েছে। এ ধরনের দুর্ঘটনা রোধে ২৫ দফা সুপারিশ ও করণীয় প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে কমিটি।

সোমবার রাতে কমিটির আহ্বায়ক ও নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মো. তোফায়েল ইসলাম মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ মেজবাহ্ উদ্দিন চৌধুরীর কাছে প্রতিবেদনটি জমা দেন।

বিষয়টি নিশ্চিত করে মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরী বেনারকে বলেন, ‘‘ওই লঞ্চ দুর্ঘটনার কারণ উদঘাটন করা গেছে। কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

তবে দুর্ঘটনার মূল কারণ অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কমিটি নয় বরং নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটির দাবি তুলেছেন বিশ্লেষকেরা।

“রেল, সড়ক কিংবা নৌ পথের যেকোনো দুর্ঘটনায় তদন্ত কমিটিগুলো হয়ে যায় ওই ডিপার্টমেন্ট সংশ্লিষ্টদের নিয়ে। তাঁরা দুর্ঘটনা সম্পর্কিত যে কারণগুলো পান সেগুলো উপসর্গের মতো। কিন্তু দুর্ঘটনার মূল কারণ বের করতে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি তৈরি করতে হবে। কারণ, সংশ্লিষ্ট ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তারা নিজেদের দোষ খুঁজে পাবেন না,” বেনারকে বলেন যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. এম শামসুল হক।

তিনি বলেন, “দায় মন্ত্রণালয়েরও হতে পারে। যেভাবে আমাদের ভ্যাসেলের সংখ্যা বাড়ছে; এমন অবস্থায় অর্গানোগ্রামে যে লোক আছে, সরকার যদি সে অনুযায়ী দক্ষ জনবল না দেয় এবং মিডিল সুপারভাইজার যারা আছে তাদের কাজ আদায় করার নিবিড় সিস্টেম তৈরি না করে, তাহলে এটা অবশ্যই গর্হিত কাজ।”

“আসলে চিরাচরিত পদ্ধতিতে তদন্ত হওয়ার কারণেই একই জিনিসের মধ্যে আমরা ঘুরপাক খাচ্ছি। বিজ্ঞানভিত্তিক মূল কারণ বের করতে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করার আগ্রহ আমাদের নেই। প্রকৃত কারণ যা ডিপার্টমেন্ট, মন্ত্রণালয়ের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে আছে তা খুঁজে বের করার মতো সৎ সাহস অর্জন করা যায়নি,” বলেন তিনি।

ঢাকা থেকে বরগুনাগামী যাত্রীবাহী অভিযান-১০ লঞ্চটি গত ২৪ ডিসেম্বর ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে পৌঁছানোর পর অগ্নিকাণ্ডের শিকার হয়, এতে মারা গেছেন অন্তত ৪৮ জন। আহত হয়েছেন ৯০ জনের বেশি।

তদন্ত প্রতিবেদনে কম লঞ্চ চালিয়ে বেশি মুনাফা অর্জনের ‘রোটেশন’ প্রথা বন্ধের সুপারিশ করেছে কমিটি। মালিকদের এ কৌশলের কারণে প্রয়োজনের তুলনায় কম লঞ্চ থাকার সুযোগে লঞ্চে গাদাগাদি করে যাত্রী তোলা হয়। এতে দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা বেড়ে যায়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে তদন্ত কমিটির একজন সদস্য বেনারকে বলেন, অভিযান-১০ লঞ্চটি প্রায় তিন মাস বসে থাকার পর আবার চালু হয়ে গত ১৯ ডিসেম্বর প্রথম ও ২৩ ডিসেম্বর দ্বিতীয় যাত্রা করে। কিন্তু এই এ দুইদিনে নৌপরিবহন অধিদপ্তরের জাহাজ জরিপকারক ও পরিদর্শক এবং বিআইডব্লিউটিএর পরিদর্শকেরা কেউই ভালোভাবে লঞ্চটি পরীক্ষা না করে দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে চরম অবহেলার পরিচয় দিয়েছেন বলে মন্তব্য করেছে কমিটি।

ইঞ্জিনে ত্রুটি জেনেও চালানো হয়

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, লঞ্চটি চাঁদপুর ঘাট অতিক্রম করার পর ইঞ্জিনে ত্রুটি দেখা দেয়। ইঞ্জিনের ত্রুটি সারতে ব্যর্থ হওয়ায় লঞ্চটি আর না চালিয়ে নিরাপদ কোনো ঘাটে আগেই ভেড়ানো উচিত ছিল। অনেক যাত্রী অনুরোধ করলেও মাস্টার ও ইঞ্জিনচালক ত্রুটিপূর্ণ লঞ্চটি চালাতে থাকেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, লঞ্চে লাগা আগুন নেভানোর কোনো চেষ্টা করা হয়নি। আগুন লাগার পর লঞ্চটির ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যায়। এ অবস্থায় আনুমানিক ১৫ মিনিট চলার পর ঝালকাঠির নদীর পাড়ে লঞ্চটি ভিড়লে সেখান থেকে লঞ্চের প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির ইঞ্জিনচালক ও ইঞ্জিনকক্ষের সহকারীরা পালিয়ে যান। নোঙর করা বা লঞ্চটি বাঁধার জন্য যথেষ্ট সময় পাওয়া সত্ত্বেও সে চেষ্টা করা হয়নি।

ফলে লঞ্চটি জোয়ারে ভাসতে ভাসতে আবার মাঝ নদীতে চলে যায়। লঞ্চটি পুড়তে পুড়তে প্রায় ৪০ মিনিট পর নদীর অপর পাড়ের গ্রামে ভেড়ে। এই সময়ে অনেক যাত্রী অগ্নিদগ্ধ হন। অনেকে নদীতে লাফ দেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, আগুন নেভানোর চেষ্টা করা হলে, লঞ্চটি চর বাটারাকান্দায় ভেড়ানোর স্থানে বাঁধলে বা নোঙর করলে হয়তো আগুনের তীব্রতা এত বৃদ্ধি পেত না। এত যাত্রীর প্রাণহানি ঘটত না।

আগুনের সূত্রপাত লঞ্চের ইঞ্জিন থেকেই হয়েছে বলে উল্লেখ করেছে তদন্ত কমিটি। এর জন্য মালিকদের দায়ী করে কমিটি বলছে, নিবন্ধন সনদ অনুযায়ী লঞ্চটির দুটি ইঞ্জিনের মোট ক্ষমতা ছিল ১ হাজার ১০০ অশ্বক্ষমতার (বিএইচপি)। কিন্তু মালিকেরা নৌপরিবহন অধিদপ্তরের অনুমতি না নিয়ে সনদের শর্ত ভেঙে অন্য জাহাজের পুরোনো ৩ হাজার ৩৬ বিএইচপির ইঞ্জিন সংযোজন করেন। পরিবর্তিত ইঞ্জিন লঞ্চটির জন্য উপযুক্ত কি না, তা উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে পরীক্ষা করানো হয়নি।

অভ্যন্তরীণ জাহাজ বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো নৌযানে ১ হাজার ২০ কিলোওয়াট বা ১ হাজার ৫০১ দশমিক ৯২ বিএইচপির চেয়ে বেশি ক্ষমতার ইঞ্জিন সংযোজন করলে লঞ্চে ইনল্যান্ড মেরিন ইঞ্জিনিয়ার (আইএমই) নিযুক্ত করতে হয়। কিন্তু লঞ্চটিতে এই পদের কেউ ছিলেন না।

নৌপরিবহন অধিদপ্তরের অনুমতি না নিয়ে মেয়াদোত্তীর্ণ ডকইয়ার্ডে লঞ্চটিতে পুরোনো ইঞ্জিন সংযোজন করার কারণে ডকইয়ার্ডের মালিককেও এ ঘটনার জন্য দায়ী করা হয়েছে।

করণীয় ও সুপারিশ

অভিযান-১০ লঞ্চের অগ্নিকাণ্ডের মতো দুর্ঘটনা রোধে রোটেশন প্রথা বন্ধ করাসহ ২৫টি করণীয় ও সুপারিশ উল্লেখ করেছে তদন্ত কমিটি। এর মধ্যে রয়েছে প্রধান প্রধান নদীবন্দর অথবা ঘাট ছেড়ে যাওয়ার আগে (বিশেষ করে সাপ্তাহিক ছুটি ও উৎসব উপলক্ষে যাত্রীর চাপের সময়) নৌ পরিবহন অধিদপ্তর ও বিআইডব্লিউটিএর পরিদর্শকদের যথাযথভাবে যাত্রীবাহী লঞ্চ পরিদর্শন করা। ঘন ঘন ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা। প্রয়োজনীয় সংখ্যায় জনবল বাড়ানো।

এ ছাড়া লঞ্চে অগ্নিপ্রতিরোধের ব্যবস্থা কমপক্ষে প্রতি তিন মাস অন্তর ফায়ার সার্ভিস বিভাগের মাধ্যমে বাধ্যতামূলকভাবে পরীক্ষা করা, লঞ্চের সব কর্মীর অগ্নিনির্বাপণযন্ত্র পরিচালনা বিষয়ে বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণের সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি।

আইন অনুযায়ী যাত্রীবাহী লঞ্চের বিমা বা নৌ দুর্ঘটনা ট্রাস্ট ফান্ড বাধ্যতামূলক করা, জরুরি নির্গমনপথ নিশ্চিত করারও সুপারিশ করা হয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনে।

তিন মালিককে আদালতে হাজির করার নির্দেশ

লঞ্চে অগ্নিকাণ্ডের মামলায় লঞ্চের তিন মালিককে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে আদালতে হাজির করতে কারা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। লঞ্চের মালিকরা হলেন; হামজালাল শেখ (৫৫), মো. শামীম আহমেদ (৪৩) ও মো. রাসেল আহম্মেদ (৪৩)।

মঙ্গলবার নৌ-আদালতের বিচারক স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জয়নাব বেগমের আদালতে তাঁদের ‘শ্যোন এরেস্ট’ দেখিয়ে কারাগার থেকে আদালতে হাজির করার জন্য আবেদন করেন রাষ্ট্রপক্ষ নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের প্রসিকিউটিং অফিসার বেল্লাল হোসাইন। আদালত আসামিদের গ্রেপ্তার দেখিয়ে তাঁদের আগামী ১৯ জানুয়ারি আদালতে হাজির করতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেয়।

এর আগে রোববার নৌ-আদালতের বিচারক স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জয়নাব বেগমের আদালতে লঞ্চের ইনচার্জ চালক মো. মাসুম বিল্লাহ ও ২য় চালক আবুল কালাম আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করেন। আদালত তাদের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেয়।

গত ২৮ ডিসেম্বর একই আদালতে লঞ্চের ইনচার্জ মাস্টার মো. রিয়াজ সিকদার ও দ্বিতীয় মাস্টার মো. খলিলুর রহমান আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করেন। আদালত তাঁদেরও জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেয়।

গত ২৬ ডিসেম্বর স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জয়নাব বেগমের নৌ-আদালতে নৌ-অধিদপ্তরের প্রধান পরিদর্শক মো. শফিকুর রহমান স্পেশাল মেরিন আইনের ৫৬/৬৬ ও ৭০ ধারায় আটজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। আসামিরা হলেন; লঞ্চের মালিক প্রতিষ্ঠান মেসার্স আল আরাফ অ্যান্ড কোম্পানির চার মালিক মো. হামজালাল শেখ, মো. শামিম আহম্মেদ, মো. রাসেল আহাম্মেদ ও ফেরদৌস হাসান রাব্বি, ইনচার্জ মাস্টার মো. রিয়াজ সিকদার, ইনচার্জ চালক মো. মাসুম বিল্লাহ, দ্বিতীয় মাস্টার মো. খলিলুর রহমান ও দ্বিতীয় চালক আবুল কালাম।

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry
Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *