রোহিঙ্গা সাংস্কৃতিক স্মৃতি কেন্দ্র তৈরির প্রতিবাদ জানালো মিয়ানমার সরকার

বেনার নিউজ:

রোহিঙ্গাদের ইতিহাস সংরক্ষণের জন্য আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) তৈরি একটি ওয়েবসাইট ‘ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্য’ উপস্থাপন করা হয়েছে দাবি করে এর প্রতিবাদ জানিয়েছে মিয়ানমারের সামরিক সরকার।

রোহিঙ্গা কালচারাল মেমরি সেন্টার নামে ওই ওয়েবসাইটটি তৈরি করেছে আইওএম। শুক্রবার মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ে এক বিবৃতিতে বলা হয়, বার্মার জনগণ ‘রোহিঙ্গা’ নামে কোনো জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব স্বীকার করে না।

“এ ধরনের ওয়েবসাইট তৈরি আইওএম-এর কাজের এখতিয়ার ও কর্মদক্ষতার সম্পূর্ণ বাইরে,” উল্লেখ করে বিবৃতিতে বলা হয় একটি জনগোষ্ঠীর ভিত্তিহীন দাবিকে সমর্থন করার প্রতিবাদ জানিয়ে গত ২৩ ডিসেম্বর জেনেভায় মিয়ানমারের স্থায়ী প্রতিনিধি আইওএম এর কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন।

“রোহিঙ্গা কথাটি বরাবরই বার্মিজ জনগণ প্রত্যাখ্যান করে এসেছে, এবং এমন গোষ্ঠীকে বার্মার জনগণ স্বীকারও করে না। পাশাপাশি, ওয়েবসাইটের ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ও বিবৃতিকেও মিয়ানমার সরকার প্রত্যাখ্যান করছে,” বলা হয় বিবৃতিতে।

বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় ও আইওএমের সাথে যোগাযোগ করে তাৎক্ষণিক কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি জনসংখ্যার মিয়ানমারে সরকারিভাবে ১৩৫টি জাতিগোষ্ঠীকে স্বীকার করা হলেও দেশটিতে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কোনো স্বীকৃতি নেই। কয়েক শতাব্দী ধরে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে বসবাস করে এলেও দেশটির সরকার তাঁদের বরাবরই অবৈধ বাঙালি অভিবাসী হিসেবে অভিহিত করে থাকে।

মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা ভোটাধিকার, চাকরি ও শিক্ষাসহ সব ধরনের নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত, এমনকি দেশটির ভেতরে স্বাধীনভাবে তাঁদের চলাচলের অধিকারও নেই।

২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমার সেনাবাহিনী রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা বসতির ওপর এক নিপীড়নমূলক ও নিষ্ঠুর অভিযান পরিচালনা করে। এর ফলে প্রাণ বাঁচাতে প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশের কক্সবাজারে এসে আশ্রয় নেন। এর আগে থেকেও বাংলাদেশে বাস করছিলেন কয়েক লাখ রোহিঙ্গা। সব মিলে বর্তমানে প্রায় এগারো লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী বসবাস করছেন বাংলাদেশে।

রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ওই অভিযানের বছরখানেক পরে আইওএম রোহিঙ্গাদের মানসিক পরিস্থিতি বোঝার জন্য একটি জরিপ চালায়, যা মূলত রোহিঙ্গা সংস্কৃতি কেন্দ্র মূল অনুপ্রেরণা তৈরি করে।

ওই জরিপ অনুযায়ী, নির্যাতন থেকে বেঁচে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের শতকরা ৪৫জনই অযথা ভীতি, আত্মহত্যা প্রবণতাসহ বিভিন্ন ধরনের মনোবৈকল্যে ভুগছেন।

“অতীতে তাঁদের ওপর ঘটে যাওয়া অমানবিক ঘটনা ও তাঁরা ভয়াবহ সহিংসতার শিকার হবার কারণে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি রয়েছে,” মন্তব্য করে ওই জরিপ।

ওই জরিপমতে, জরিপকৃত রোহিঙ্গাদের অর্ধেকই নিজেদের ‘পরিচয় সংকটে’ ভুগছেন। ২০১৭ সালে ভিটেবাড়ি ছেড়ে আসা রোহিঙ্গাদের চারভাগের তিনভাগই জানিয়েছেন, দেশ ছাড়ার কারণে তাঁদের সংস্কৃতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ওই জরিপের ফলাফলের ওপর ভিত্তি করেই রোহিঙ্গা সাংস্কৃতিক স্মৃতি কেন্দ্র তৈরি করা হয়েছে বলে জানায় আইওএম।

মিয়ানমারের একটি জাতিগোষ্ঠী হিসাবে রোহিঙ্গাদের সাংস্কৃতিক জ্ঞান বিনিময়, তাঁদের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ করাই কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে এই কেন্দ্র তৈরির অন্যতম উদ্দেশ্য বলে জানায় আইওএম।

নিজের দাদি ও মায়ের কাছ থেকে শেখা ভাঁপা পিঠা তৈরি করে দেখাচ্ছেন রোহিঙ্গা নারী দিলদারা বেগম। [ছবি: রোহিঙ্গা কালচারাল মেমরি সেন্টার]

রোহিঙ্গারা যেন শেকড়ের সংস্কৃতি মনে রাখতে পারে

কেন্দ্রটি ওয়েবসাইট দিয়ে শুরু হলেও কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে এর একটি ভৌত কাঠামো রয়েছে বলে বেনারকে জানান অতিরিক্ত শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ সামছু-দৌজ্জা।

“রোহিঙ্গাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ করার উদ্দেশ্যে” উখিয়ার কুতুপালং শরণার্থী শিবিরের ক্যাম্প-১৮ তে কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে জানিয়ে শুক্রবার তিনি বেনারকে বলেন, “এটি রোহিঙ্গাদের তাঁদের অতীত মনে করতে সহায়তা করবে।”

সংস্কৃতি কেন্দ্রের ওয়েবসাইটে রোহিঙ্গাদের ঐতিহ্যবাহী খাবার, শিল্পকর্ম, বাদ্যযন্ত্রসহ বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক উপাদান উপস্থাপন করা হয়েছে।

মিয়ানমার সরকারের বিবৃতি অনুযায়ী, গত ১০ ডিসেম্বর হেগ শহরে ‘শিল্প, জীবন, রোহিঙ্গা’ নামে আইওএম ও বাংলাদেশ দূতাবাস যৌথভাবে একটি অনলাইন প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে, যেখানে গিয়ে দর্শনার্থীরা থ্রি-ডি ছবিতে ক্লিক করে ভার্চুয়ালি কেন্দ্রের বিভিন্ন কক্ষ পরিদর্শন করতে পারেন।

বিশ্বের বিভিন্ন বিশেষজ্ঞদের বরাত দিয়ে কেন্দ্রের ফ্যাক্ট শিটে আইওএম জানায়, একটি জনগোষ্ঠী নিজেদের যেভাবে বিশ্বের কাছে পরিচিত করাতে চায় সেটিই সেই গোষ্ঠটির সাংস্কৃতিক ও জাতিগত পরিচয়।

“এটা সত্য যে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ বরাবরই রোহিঙ্গাদের পরিচয়কে প্রশ্ন করে এসেছে,” বলে আইওএম।

রোহিঙ্গারা যেন তাঁদের পুরনো ইতিহাস, স্মৃতি ভুলে না যায় এবং তাঁদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ করার জন্যই কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে জানিয়ে বান্দরবানের ঘুমধুম নো মেনস ল্যান্ড রোহিঙ্গা শিবিরের মাঝি দীল মোহাম্মদ বেনারকে বলেন, “এটি খুবই ভালো একটি উদ্যোগ।”

“আমরা মিয়ানমারে থাকতে আমাদের মুরব্বিরা এ ধরনের স্মৃতিগুলো আমাদের সামনে প্রদর্শন করত। এই কেন্দ্রের উদ্দেশ্য হচ্ছে, রোহিঙ্গারা যেন তাঁদের ইতিহাস, তাঁদের শেকড়ের সংস্কৃতি মনে রাখতে পারে,” বলেন দীল মোহাম্মদ।

প্রতিবেদনটিতে কক্সবাজার থেকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন সুনীল বড়ুয়া।

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry
Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *