রেলওয়ের প্রকল্প: ব্যয় কমাতে বলায় অর্থায়ন থেকে সরে গেছে চীন

বেনার নিউজ:

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের হস্তক্ষেপে বাংলাদেশ রেলওয়ের একটি প্রকল্প থেকে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা ব্যয় কমিয়েছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। আর সে কারণেই আখাউড়া-সিলেট রেলপথ উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়ন না করার কথা সরকারকে জানিয়েছে চীনা কর্তৃপক্ষ।

বিষয়টি বেনারের কাছে নিশ্চিত করেছেন রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন। 

চীনা অর্থায়নে পরিচালিত উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয়ের ব্যাপারে কঠোর সমালোচনা থাকলেও এই প্রথমবারের মতো একটি প্রকল্পের ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নিলো সরকার। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি একটি ভালো উদ্যোগ এবং এর ফলে বিদেশি অর্থায়নে বাস্তবায়িত প্রকল্পের ব্যয়ের ব্যাপারে স্বচ্ছতা আসার সুযোগ হবে। 

মন্ত্রী সুজন বুধবার বেনারকে বলেন, “আখাউড়া-সিলেট রেলপথকে মিটারগেজ থেকে ব্রডগেজে রূপান্তর প্রকল্পে চীনা কর্তৃপক্ষ অর্থায়ন করবে না বলে আমাদের জানিয়েছে। এই প্রকল্পের মূল খরচ থেকে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা (৪৭২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) খরচ কমানোর পর এই প্রকল্প তারা বাস্তবায়ন করবে না বলে জানিয়েছে।” 

চীনা কর্তৃপক্ষ ও রেলপথ মন্ত্রণালয় আলোচনার মাধ্যমে এই প্রকল্পে ১৬ হাজার ১০৪ কোটি টাকার বেশি ব্যয় নির্ধারণ করে। এর মধ্যে চীন দেবার কথা ১০ হাজার কোটি টাকা, বাকিটা বাংলাদেশ। 

এই প্রকল্পের অর্থায়ন থেকে সরে দাঁড়ানোর কারণ সম্পর্কে মন্তব্য জানতে ঢাকাস্থ চীনা দূতাবাসে বেনারের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলেও কোনো জবাব মেলেনি।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মানিত ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বেনারকে বলেন, “আমরা যা দেখি তা হলো, সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিটের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা প্রকল্পে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রকৃত খরচের অনেক বেশি ব্যয় ধরা হয়।”

তিনি বলেন, “বাংলাদেশ ও অন্যান্য দেশে চীনা অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পের খরচের ব্যাপারে মারাত্মক সমালোচনা রয়েছে। বলা হয়, প্রকৃত খরচের চেয়ে ব্যয় দেখানো হয় অনেক বেশি।”

ড. মোস্তাফিজুর বলেন, “বাংলাদেশে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সরকার চীনাদের কাছ থেকে যে সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিট নিচ্ছে সেগুলোর ব্যয় বেশি হয়েছে।”

তিনি বলেন, “এই প্রথমবারের মতো আমরা দেখলাম যে সরকার প্রকল্পের বেশি ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে, এটি একটি ভালো সিদ্ধান্ত। এর মাধ্যমে বিদেশি অর্থায়নে বাস্তবায়িত প্রকল্পের উচ্চ ব্যয়ের বিষয়টি খতিয়ে দেখা শুরু হবে বলে আমি মনে করি।”

বাংলাদেশের সব সরকারের আমলেই সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে চীন। বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক মূলত উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। 

চীন বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় উন্নয়ন ও ব্যবসায়িক সহযোগী। চীনা কোম্পানি বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ করছে।

২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে চীনা রাষ্ট্রপতি শি জিংপিং এর ঢাকা সফরের মধ্য দিয়ে ঢাকা-বেইজিং সম্পর্ক আরও একধাপ এগিয়ে যায়।

ওই সফরে শি জিংপিং বাংলাদেশকে ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রকল্প সাহায্য দেয়ার ঘোষণা দেন। এই লক্ষ্যে দুই দেশের কর্মকর্তারা একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেন।

এই প্রকল্পগুলো মূলত চীনের “ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড” প্রকল্পের অংশ বলে অনেকে মনে করলেও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কোনো পর্যায়ে “ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড” শব্দটি ব্যবহার করা হয় না। 

অর্থ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের এশিয়া অনুবিভাগের প্রধান যুগ্ম সচিব শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী বুধবার বেনারকে বলেন, ২০১৬ সালের পর থেকে চীন সরকার মোট নয়টি প্রকল্পে প্রায় সাত বিলিয়ন মার্কিন ডলার দিয়েছে। 

বেশি খরচের প্রকল্প

বাংলাদেশের নিয়মানুযায়ী, কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রথম ধাপ হলো প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদন।

২০১৯ সালের ৯ এপ্রিল আখাউড়া-সিলেট রেলপথ প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদিত হয়। খরচ নির্ধারণ করা হয় ১৬ হাজার ১০৪ কোটি টাকা। 

বেনারের হাতে আসা রেলওয়ের একটি দলিল অনুযায়ী, আখাউড়া-সিলেট রেলপথ প্রকল্প বাস্তবায়নে চীনা সরকার ১০ হাজার ৬৫৪ টাকা দিতে রাজি হয়। বাকি টাকা দেবে বাংলাদেশ সরকার। 

এই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ঠিকাদার হিসাবে অনুমোদন দেয়া হয় চায়না রেলওয়ে কন্সট্রাকশন ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যুরো গ্রুপ লিমিটেডকে। শর্ত অনুযায়ী, কোনো দরপত্র ছাড়াই সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে এই প্রকল্পের ঠিকাদার নির্বাচন করে চীনা কর্তৃপক্ষ। 

অর্থ ছাড়ের ব্যাপারে চীনা সরকার ও রেলপথ মন্ত্রণালয়ের চুক্তি সম্পন্ন করতে অগ্রসর হলে গত বছর নভেম্বর মাসে আপত্তি আসে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে।

“প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর পর্যালোচনা করে দেখেছে যে এই প্রকল্পের ব্যয় অতিমাত্রায় বেশি। সেকারণে তারা এই খরচ কমাতে নির্দেশ দিয়েছে,” বলেন রেলপথ মন্ত্রী সুজন। 

তিনি বলেন, “প্রায় চার হাজার কোটি টাকা খরচ কমানোর সিদ্ধান্ত আমরা চীনা কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। এখন তাঁরা এই প্রকল্পে অর্থায়ন করতে পারবে না বলে জানিয়েছে।”

মন্ত্রী বলেন, “তাঁদের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করানোর জন্য আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।”

বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা সলিমুল্লাহ বাহার বেনারকে বলেন, রেলের কোনো প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাঁরা কিছু কিছু মানদণ্ড ব্যবহার করে থাকেন।

তিনি বলেন, “প্রতি কিলোমিটারে সম্ভাব্য কত খরচ হবে সেটির একটি হিসাব আছে। সেই অনুযায়ী আমরা খরচ নির্ধারণ করে থাকি।”

সলিমুল্লাহ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে একটি কারিগরি কমিটি গঠন করে আখাউড়া-সিলেট রেলপথ প্রকল্পের খরচ পর্যালোচনা করে দেখেছে যে প্রকল্পটির খরচ বেশি।

বাংলাদেশ রেলওয়ের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশনস) কাজী আসাদুল্লাহ বুধবার বেনারকে বলেন, ব্রিটিশ আমলে ১৮৯১ থেকে ১৮৯৬ সালের মধ্যে আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে নির্মাণের অংশ হিসাবে আখাউড়া-সিলেট-করিমগঞ্জ (আসাম) মিটারগেজ রেল লাইনটি নির্মিত হয়। সিলেট থেকে আখাউড়ার দূরত্ব ১৭৯ কিলোমিটারের মতো।

তিনি বলেন, মাঝে মধ্যে মেরামতের কাজ করা হলেও নির্মাণের পর থেকে এই লাইনের তেমন বড়ো কোনো উন্নয়ন কাজ করা হয়নি।

রেলপথের দুরবস্থার কারণে প্রায়ই এই লাইনে ট্রেন লাইনচ্যুত হয়। একবার গাড়ি লাইনচ্যুত হলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকে, সাধারণ মানুষের ভোগান্তি হয় বলে জানান আসাদুল্লাহ। 

তিনি বলেন, “ভবিষ্যতে পৃথিবীর কোথাও মিটার গেজ ট্রেন থাকবে না। আমাদের এখানেও মিটারগেজ ট্রেন থাকবে না। তাই সরকারের উচিত যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই লাইনের উন্নয়ন করা যাতে একই লাইনে মিটার ও ব্রডগেজের ট্রেন চলতে পারে।”

সাধারণত এক মিটার দূরত্বে দুই পাতের রেলপথকে মিটার গেজ ও দেড় মিটারের মতো প্রশস্ত রেলপথকে ব্রডগেজ বলা হয়। ব্রডগেজে অনেক ক্ষেত্রে তিন পাতের রেলপথ থাকে। চওড়া ও বাড়তি পাতের কারণে ব্রডগেজ তুলনামূলক নিরাপদ ও বেশি কার্যকর।

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry
Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *