রাঙ্গামাটিতে স্থানীয় দুই সশস্ত্র সংগঠনের গোলাগুলি, দুই পক্ষের দুজন নিহত

বেনার নিউজ:

রাঙ্গামাটিতে সশস্ত্র দুই আঞ্চলিক সংগঠনের কর্মীদের সংঘর্ষে দুইজন নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছে স্থানীয় পুলিশ।

স্থানীয় আঞ্চলিক সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) এবং ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) কর্মীদের মধ্যে বুধবার দুপুরে জেলার বাঘাইছড়ির রূপকারী ইউনিয়নে

এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

“সেখানে গুলিবিদ্ধ হয়ে দুইজনের মৃত্যু হয়েছে,” বেনারকে জানান বাঘাইছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনোয়ার হোসেন খান।

জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জেএসএসের মূলধারার (জেএসএস-সন্তু লারমা) সাথে ইউপিডিএফের বিদ্রোহী অংশ (ইউপিডিএফ-গণতান্ত্রিক) এই সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছিল বলে বেনারকে জানিয়েছেন স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শরিফুল ইসলাম।

“নিহত দুজনের একজন জেএসএস মূলধারার এবং অন্যজন ইউপিডিএফ-গণতান্ত্রিকের নেতা বলে আমরা জানতে পেরেছি,” বেনারকে বলেন এই কর্মকর্তা।

তাঁর দেওয়া তথ্যানুযায়ী, দুই পক্ষের ওই বন্দুকযুদ্ধ প্রায় ৩০-৪০ মিনিট স্থায়ী ছিল। বাঘাইছড়িতে এ ধরণের ঘটনা প্রায়ই ঘটে। গত এক বছরে কমপক্ষে ছয়-সাতটি বড়ো ধরনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছে।

“এখানে জেএসএস এবং ইউপিডিএফ-এর মূলধারা ও বিদ্রোহী অংশ, অর্থাৎ চারটি পক্ষই বেশ সক্রিয়,” যোগ করেন বাঘাইছড়ির ইউএনও।

নিহত তজিম চাকমা ওরফে তুজিম চাকমা (৩২) জেএসএস-সন্তু লারমার নেতা এবং জানং চাকমা ওরফে জেনন চাকমা (৩৮) ইউপিডিএফ-গণতান্ত্রিকের। তজিমের বাড়ি উপজেলার বাঘাইছড়ি ইউনিয়নের আর জেননের বঙ্গলতলী ইউনিয়নে।

তাঁদের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য খাগড়াছড়ি জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে বলে জানায় পুলিশ। এ ছাড়া সংঘর্ষ চলাকালে মনু মিয়া (৩০) নামের এক বাঙালিও গুলিতে আহত হয়েছেন বলে কর্মকর্তারা বেনারকে নিশ্চিত করেছেন।

অতর্কিত হামলার অভিযোগ

ইউপিডিএফ-গণতান্ত্রিকের প্রধান নেতা এবং রূপকারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শ্যামল চাকমা স্থানীয় সাংবাদিকদের জানান, তাঁর সংগঠনের উপজেলা সমন্বয়ক জেনন চাকমার ওপরে অতর্কিত হামলা চালিয়ে তাঁকে গুলি করে হত্যা করে সন্তু লারমার দলের কয়েকজন।

তবে জেএসএস-সন্তু লারমা গ্রুপের স্থানীয় নেতা ত্রিদিপ চাকমা সাংবাদিকদের বলেন, “আমাদের দলে কোনো সন্ত্রাসী বা অস্ত্রধারী নেই।” ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) ও জেএসএসের সংস্কারপন্থী অংশের (জেএসএস-এমএন লারমা) মধ্যে গোলাগুলি হয়েছে দাবি করে তিনি এই হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানান।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে জেএসএস-এমএন লারমা গ্রুপের নেতা ও রূপকারী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য সমর বিজয় চাকমাকে (৩৮) উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কক্ষের ভেতর ঢুকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল।

তখন জেএসএস-এর এই বিদ্রোহী অংশের কেন্দ্রীয় কমিটির আইন বিষয়ক সম্পাদক ও উপজেলা চেয়ারম্যান সুদর্শন চাকমা বেনারকে বলেছিলেন, “জেএসএস-সন্তু লারমা গ্রুপের সন্ত্রাসীরাই তাঁকে হত্যা করেছে। চার-পাঁচ মাস আগে সমরের বড়ো ভাইকেও একইভাবে হত্যা করেছিল তারা।”

এই সংঘাত আদর্শিক নয়

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. কে এম মহিউদ্দিন বেনারকে বলেন, “সাম্প্রতিক সময়ে পাহাড়ি সংগঠনগুলোর মধ্যে যে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতের ঘটনাগুলো ঘটছে, তার কারণ যতটা না আদর্শিক, তার চেয়ে অনেক বেশি আর্থিক। এটা মনে করার কারণ নেই তারা সবকিছু জাতিগত মুক্তির জন্যই করছে। এখানে টাকা-পয়সাই মুখ্য।”

পার্বত্য এলাকায় আঞ্চলিক সংগঠনগুলো চাঁদাবাজির প্রতিযোগিতার কারণেই সেখানে প্রভাব বিস্তারের দ্বন্দ্ব বাড়ছে বলে মনে করেন এই বিশ্লেষক। “পাহাড়ে এখন প্রচুর বিনিয়োগ হচ্ছে, বিশেষ করে পর্যটন খাতে। সেই সূত্রে বিভিন্ন ব্যবসার সুযোগও বেড়েছে। যে কারণে যারা যত বড়ো এলাকা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে, তাদের আয় তত বেশি,” বলেন তিনি।

সরকারের সাথে পাহাড়িদের “সন্দেহ বা বিশ্বাসের ঘাটতি”র কারণে পার্বত্য শান্তি চুক্তি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হচ্ছে না বলে অভিমত এই অধ্যাপকের।

উল্লেখ্য, জেএসএস-এর মূলধারার প্রধান নেতা সন্তু লারমার নেতৃত্বে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর সরকারের সঙ্গে শান্তি চুক্তি হলেও পাহাড়িদের একটি অংশ শুরু থেকেই এর বিরোধিতা করে আসছে।

এর আগে ১৯৭৩ সালে পাহাড়িদের অধিকার আদায়ে প্রতিষ্ঠিত জেএসএস ১৯৭৫ সালে তাদের সামরিক শাখা শান্তিবাহিনী গঠনের মাধ্যমে বাংলাদেশ এবং পাহাড়ে বসতি স্থাপনকারী বাঙালিদের বিরুদ্ধে লড়াই করে আসছিল।

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry
Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *