বিএসএফের টহল এলাকা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত: পশ্চিমবঙ্গ ও পাঞ্জাবের প্রত্যাখ্যান

বেনার নিউজ:

ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) টহল এলাকা সীমান্তের শূন্য রেখা থেকে অভ্যন্তরে প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি করে নির্দেশনা জারি হওয়ার পর কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ ও পাঞ্জাব সরকারের বিরোধ তুঙ্গে উঠেছে। ভারতজুড়ে চলছে রাজনৈতিক বিতর্ক।

এতদিন বিএসএফের কাজের পরিধি ছিল সীমান্তের শূন্য রেখা থেকে অভ্যন্তরে ১৫ কিলোমিটার, যা বাড়িয়ে তিনটি রাজ্যে ৫০ কিলোমিটার করেছে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। পশ্চিমবঙ্গ ও পাঞ্জাব বিধানসভায় কেন্দ্রীয় সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে প্রস্তাব পাশ হয়েছে। ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) শাসিত আসাম অবশ্য কেন্দ্রের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে।

নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর নেতারা এই ইস্যুতে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন।

কলকাতার চারুচন্দ্র কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক বিমলশঙ্কর নন্দ বেনারকে বলেন, “বিএসএফের ক্ষমতা বৃদ্ধি নতুন কোনো ঘটনা নয়। এর আগে ইউপিএ আমলেও একাধিকার ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়েছে।”

“রাজ্যের সঙ্গে বিরোধ হয় এমন কোনো কাজ বিএসএফ করে না” উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাজ্য পুলিশের সঙ্গে সহযোগিতা করেই তারা কাজ করে থাকে।

তাঁর মতে, “যত দিন যাচ্ছে সীমান্তে বিএসএফকে নিত্যনতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে। জঙ্গি থেকে চোরাচালানের নেটওয়ার্ক, এমনকি গরু পাচারকারীরাও রাজ্যের অনেকটা ভিতরে বসেই কাজ করছে। তাই বিএসএফের কাজের এলাকা বাড়ানো জরুরি ছিল।”

পাঞ্জাব ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারগুলো এই ইস্যুতে রাজ্যের স্বাধিকারের ভুল ব্যাখ্যা করছে বলে মনে করেন অধ্যাপক বিমলশঙ্কর।

তবে রাজ্যের সীমান্ত এলাকায় বিভিন্ন কাজের সঙ্গে যুক্ত মানবাধিকার সংগঠন বাংলার মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চের (মাসুম) সম্পাদক কিরীটি রায় কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন।

কিরীটি রায় বৃহস্পতিবার বেনারকে বলেন, “বিএসএফের প্রধান কাজ সীমান্ত সুরক্ষিত রাখা। কিন্তু তা সঠিকভাবে করতে না পারা সত্ত্বেও কাজের এলাকা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। এটি আসলে যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা লঙ্ঘন করে সশস্ত্র বাহিনীর মাধ্যমে রাজ্যকে নিয়ন্ত্রিত করার চেষ্টা।”

ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির বিরোধী সীমান্তবর্তী রাজ্য সরকার ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে ভারত সরকারের একতরফা সিদ্ধান্তের সমালোচনা করা হয়েছে।

এদিকে বিএসএফের পক্ষ থেকে গত বুধবার এক বিবৃতিতে জানানো হয়, “কাজের পরিধি বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত প্রকৃতপক্ষে রাজ্য পুলিশকেই শক্তিশালী করবে। রাজ্য পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় রেখেই যৌথভাবে কাজ করা হয়। সীমান্তবর্তী এলাকায় নজরদারি, চেকিং থেকে শুরু করে মানবপাচার বিরোধী ইউনিট তৈরির মতো সব কাজই রাজ্য পুলিশকে সঙ্গে নিয়েই করা হয়।”

ক্ষমতা সীমিতই থাকছে: বিএসএফ

সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোর সঙ্গে আলোচনা না করে একতরফাভাবে বিএসএফের কাজের পরিধি বৃদ্ধির সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে গত মঙ্গলবার পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস শাসিত সরকারের আনা একটি প্রস্তাব ১১২ ভোটে পাশ হয়, বিপক্ষে ভোট পড়ে ৬৩।

এর আগে পাঞ্জাব বিধানসভাতেও ভারত সরকারের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে সর্বসম্মত প্রস্তাব পাশ হয়। দুটি প্রস্তাবই কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য পাঠানো হবে।

পশ্চিমবঙ্গের পরিষদীয় মন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় মঙ্গলবার রাজ্য বিধানসভায় কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে প্রস্তাব পেশ করে বলেন, ভারত সরকারকে অবিলম্বে সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করতে হবে।

তিনি বলেন, কাজের পরিধি বৃদ্ধির সিদ্ধান্তের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোতে আঘাত করা হয়েছে। কেননা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার বিষয়টি সম্পূর্ণভাবেই রাজ্যের এখতিয়ারভুক্ত।

পশ্চিমবঙ্গের শাসক তৃণমূল কংগ্রেসের অভিযোগ, “কেন্দ্রীয় সরকার প্রকৃতপক্ষে পিছনের দরজা দিয়ে রাজ্যের এলাকা দখল করতে চাইছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে রাজ্যের ১১টি জেলা সম্পূর্ণভাবেই বিএসএফের এখতিয়ারে চলে যাবে।”

তবে ভারতের জনতা পার্টির পক্ষ থেকে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আনা প্রস্তাবের বিরোধিতা করে বলা হয়, “ভারত সরকারের সিদ্ধান্ত চোরাচালান ও জঙ্গি কার্যকলাপ রুখতে জরুরি ছিল। জনতা পার্টি পশ্চিমবঙ্গে বিএসএফের কাজের পরিধি ৮০ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি করার পক্ষে মত দেয়।

জঙ্গি অনুপ্রবেশ, সীমান্তে চোরাচালান, মাদক ও গরু পাচারের মতো আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবেলা করে আন্তর্জাতিক সীমান্ত সুরক্ষা রাখার কথা জানিয়ে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক গত ১১ অক্টোবর এক নির্দেশে বিএসএফের আইন সংশোধন করে। এতে পশ্চিমবঙ্গ, পাঞ্জাব ও আসামে বিএসএফের  কাজের পরিধি ৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়।

এর ফলে বিএসএফ সীমান্তের শূন্য রেখা থেকে অভ্যন্তরে ৫০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে তল্লাশি, গ্রেপ্তার, আটক ও পণ্য বাজেয়াপ্ত করতে পারবে। আগে তাদের কাজের এলাকা ছিল ১৫ কিলোমিটার পর্যন্ত।

কাজের এলাকা বৃদ্ধি প্রসঙ্গে বিএসএফের অতিরিক্ত ডিরেক্টর জেনারেল ওয়াই বি খুরানিয়া বুধবার সাংবাদিকদের বলেন, “আমাদের হাতে এফআইআর করার ক্ষমতা থাকছে না। সীমান্তে আমরা যখনই কোনো ব্যক্তিকে আটক করি বা পণ্য বাজেয়াপ্ত করি, তখন তা পুলিশের হাতেই তুলে দেওয়া হয়। সেক্ষেত্রে বিএসএফের ক্ষমতা সীমিতই থাকছে।”

কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে রাজ্য বিধান সভায় বিধায়ক তাপস রায় বলেছেন, গত পাঁচ বছরে বিএসএফের বিরুদ্ধে ২৪০টি অত্যাচার, ৬০টি খুন এবং ৮টি নিখোঁজের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও বিএসএফের ক্ষমতা বৃদ্ধির নামে ঘুরপথে রাজ্যের এক তৃতীয়াংশ বিজেপি শাসন করবে, এটা হতে দেওয়া যায় না।

কিরীটি রায়ের মতে, সীমান্তের মানুষ যেভাবে বিএসএফের হাতে নিয়মিত নির্যাতিত হন, তাতে সেখানকার মানুষ নতুনভাবে আতঙ্কিত হয়ে উঠেছেন।

কেন্দ্র বনাম রাজ্যের এখতিয়ার বিতর্ক

ভারত সরকার সীমান্ত সুরক্ষার প্রয়োজনে বিএসএফের ক্ষমতা বৃদ্ধির যুক্তি দিলেও বিজেপি বিরোধী সীমান্তবর্তী রাজ্য সরকারগুলো কেন্দ্রের সিদ্ধান্তে সন্দেহ প্রকাশ করেছে।

পাঞ্জাবের কংগ্রেস সভাপতি নভজ্যোত সিং সিধু সাংবাদিকদের বলেন, রাজ্যের মধ্যে রাজ্য তৈরি করে কেন্দ্রীয় সরকার দেশের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকেই দুর্বল করছে।

পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়ক উদয়ন গুহ বেনারকে বলেন, “কেন্দ্রের সিদ্ধান্তের ফলে রাজ্যের ১০টি জেলার ৬৫টি ব্লক, বিশেষ করে প্রায় গোটা উত্তরবঙ্গ বিএসএফের এখতিয়ারে চলে যাবে, যা চক্রান্ত ছাড়া আর কিছু নয়।”

এই ইস্যুতে পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্ট পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পাশে দাঁড়িয়েছে। বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসু বলেন, “সংবিধানের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে উপেক্ষা করে কেন্দ্র এই ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।”

তিনি মনে করেন, “বিএসএফের এলাকা বৃদ্ধির ফলে সীমান্তবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকার লক্ষ লক্ষ বাসিন্দাদের জীবনে ভয়ঙ্কর বিপর্যয় নেমে আসবে।”

অবশ্য সংবিধান বিশেষজ্ঞ সুভাষ কাশ্যপ সংবাদমাধ্যমে বলেন, সংবিধানের ৩৫৫ ধারা অনুযায়ী কেন্দ্রীয় সরকারের এই ধরণের সিদ্ধান্ত নেবার অধিকার রয়েছে। এ নিয়ে অযথা রাজনৈতিক বিতর্ক করা হচ্ছে।

তবে সাবেক স্বরাষ্ট্র সচিব জি কে পিল্লাই সাংবাদিকদের বলেন, আইন শৃঙ্খলার বিষয়টি রাজ্যের এখতিয়ারভুক্ত। কেন্দ্র সিদ্ধান্ত নেবার আগে রাজ্যের সঙ্গে আলোচনা করলে ভালো করত।

নয়াদিল্লির মনোহর পানিক্কর ইন্সটিউট অব ডিফেন্স স্টাডিজ এন্ড এনালিসিসের রিসার্চ ফেলো ড. পুষ্পিতা দাস কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বেনারকে বলেন, সীমান্ত এলাকা সুরক্ষিত রাখতে সীমান্তবাসীদের সঙ্গে আলোচনা ও তাদের উৎসাহিত করা দরকার। এজন্য বিএসএফের জওয়ানদের স্থানীয় মানুষের আচার আচরণ, রীতিনীতি, ভাষা ও ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতন করার কাজটি করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, “এলাকা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত ঘিরে কোনো রকম দ্বিধা তৈরি হলে তা দূর করতে সরকারকে উপযুক্ত গাইডলাইন তৈরি করতে হবে। এজন্য জেলা ও রাজ্য সমন্বয় কমিটি তৈরি ও নোডাল অফিসার নিয়োগের মাধ্যমে সব এজেন্সির মধ্যে সমন্বয় সাধন করা দরকার।”

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry
Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *