বায়োপসির নমুনা দিলেন খালেদা জিয়া, অবস্থা ‘শঙ্কামুক্ত’

বেনার নিউজ:

বায়োপসির জন্য শরীর থেকে নমুনা নেওয়ার পরে ঢাকার একটি হাসপাতালে নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (আইসিইউ) রয়েছেন বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। তবে তিনি শঙ্কামুক্ত বলে সোমবার বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে জানান তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান এ জেড এম জাহিদ হোসেন। 

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়াকে বিদেশে নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার দাবি জানান। 

৭৬ বছর বয়সী খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যগত অবস্থা জানিয়ে জাহিদ হোসেন বলেন, “মেডিকেল বোর্ড বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর দেখলেন উনার একটি ছোট বায়োপসি করা প্রয়োজন। কারণ, উনার শরীরের এক জায়গায় ছোট একটা লাম্প আছে। এই লাম্পের নেচার অব অরিজিন জানতে বায়োপসি করা প্রয়োজন। সেজন্য আজ অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে বায়োপসি করা হয়েছে।” 

‘লাম্পের’ ব্যাখ্যা দিয়ে অধ্যাপক জাহিদ বলেন, লাম্প শব্দের অর্থ হচ্ছে ছোট চাকা, যার সাইজ এক দশমিক দুই সেন্টিমিটারের কাছাকাছি।

তিনি জানান, বায়োপসি শেষে খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল রয়েছে, খালেদা জিয়া বর্তমানে সার্জিক্যাল আইসিইউতে চিকিৎসাধীন আছেন। 

“খালেদা জিয়ার পরবর্তী চিকিৎসা কী হবে তা বায়োপসি প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করবে” জানিয়ে জাহিদ হোসেন বলেন, প্রতিবেদন পেতে ১৫ থেকে ২১ দিন সময় লাগতে পারে। 

“বেগম খালেদা জিয়া এখন সুস্থ আছেন। কিছুক্ষণ আগে তাঁর সঙ্গে আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান (তারেক রহমান) কথা বলেছেন। তাঁর ভাই (শামীম এস্কান্দার) কথা বলেছেন,” সংবাদ সম্মেলনে বলেন মির্জা ফখরুল। 

“ডাক্তাররা নিশ্চিত করেছেন যে তিনি সুস্থ আছেন এবং ভালো আছেন। কোনো রকম বিপদের আশঙ্কা নেই বলেই তাঁরা মনে করেন,” যোগ করেন তিনি। 

এর আগে ১২ অক্টোবর খালেদা জিয়াকে বসুন্ধরার এভার কেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। 

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেয় ঢাকার একটি আদালত। এরপর ৩০ অক্টোবর এ মামলায় আপিলে তাঁর আরো পাঁচ বছরের সাজা বাড়িয়ে ১০ বছর করে হাইকোর্ট। 

একই বছরের ২৯ অক্টোবর জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় খালেদা জিয়াকে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেয় একই আদালত। রায় ঘোষণার পর প্রথমে তাঁকে পুরান ঢাকায় অবস্থিত পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি রাখা হয়। প্রায় দুই বছর কারাগারে ছিলেন খালেদা। 

তবে বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে পরিবারের আবেদনের প্রেক্ষিতে নির্বাহী আদেশে দণ্ড স্থগিত করে খালেদা জিয়াকে শর্তসাপেক্ষে ২০২০ সালের ২৫ মার্চ ছয় মাসের জন্য মুক্তি দেয় সরকার। কারা তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিএসএমএমইউ হাসপাতাল থেকে মুক্তি পান বেগম জিয়া। 

তাঁকে দেশের অভ্যন্তরে বিশেষায়িত চিকিৎসা নেয়ার শর্তে এই মুক্তি দেয়া হয়। শর্তমতে, এই সময়ের মধ্যে তিনি দেশের বাইরে যেতে পারবেন না। 

পরে পরিবারের আবেদনের প্রেক্ষিতে কয়েক দফা এই মুক্তির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। তবে, দল ও পরিবারের অনুরোধ সত্ত্বেও সরকার তাঁকে চিকিৎসার জন্য দেশ ছাড়ার অনুমতি দেয়নি। 

খালেদা জিয়া বহু বছর ধরে আর্থরাইটিস, ডায়াবেটিস ও চোখের সমস্যায় ভুগছেন। গুলশানের বাসায় অবস্থানের সময় গত এপ্রিলে তিনি করোনাভাইরাসেও আক্রান্ত হয়েছিলেন। 

বিদেশে উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন: ফখরুল 

মেডিকেল বোর্ডের উদ্ধৃতি দিয়ে সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির মহাসচিব আবারও উন্নত চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়াকে বিদেশে নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার দাবি জানান। 

তিনি বলেন, “খালেদা জিয়াকে বিদেশে উন্নত চিকিৎসার জন্য নেওয়ার বিষয়ে তার মেডিক্যাল বোর্ড পরামর্শ দিয়েছেন। ম্যাডাম বিপদমুক্ত। তবে যতগুলো পুরনো ডিজিজ তাঁর আছে, এ জন্য তাঁর মাল্টি অ্যাডভান্স সেন্টারে চিকিৎসা প্রয়োজন। আমাদের দেশের হাসপাতালগুলোতে এই ব্যবস্থা নেই। এটা আমরা বারবার বলে আসছি।” 

বিএনপি মহাসচিব বলেন, “এর জন্য কোনো আইনগত বাধা আছে বলে মনে করি না। কারণ, এই মামলায় জামিন তাঁর প্রাপ্য, এটা তাঁর প্রতি দয়া নয়। সরকারের উচিত অবিলম্বে তাঁকে বিদেশে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়া।” 

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. দিলারা চৌধুরীর মতে, খালেদা জিয়ার “ব্যাকগ্রাউন্ড, বয়স বিবেচনা করে সরকারের উচিত তাঁকে বিদেশে চিকিৎসার অনুমতি দেওয়া।” 

সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে বিদেশ যাওয়ার অনুমতি না দেওয়া দেওয়া “সম্পূর্ণ রাজনৈতিক কারণেই,” মন্তব্য করে তিনি বেনারকে বলেন, “সরকারের পক্ষ থেকে আদালতের দোহাই দেওয়া হলেও এটাই সত্যি যে, ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁকে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না।” 

“এটা অত্যন্ত অমানবিক। এখানে মানবাধিকারের লঙ্ঘন ঘটছে,” বলেন ড. দিলারা চৌধুরী। 

তাঁর মতে, “আসলে দেশে গণতন্ত্র নাই। মৌলিক অধিকার বলে কিছু নাই। এ কারণেই রাজনৈতিক প্রতিশোধের শিকার হচ্ছেন খালেদা জিয়া।” 

তবে খালেদা জিয়া বিদেশ যেতে চাইলে তাঁকে কারাগারে গিয়ে নতুন করে আবেদন করতে হবে বলে এর আগে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক।

তাঁর মতে, ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ ধারা অনুযায়ী খালেদা জিয়াকে বিদেশে পাঠানোর আবেদন পুনর্বিবেচনার সুযোগ নেই। তাঁকে কারাগারে গিয়ে নতুন করে আবেদন করতে হবে। তবে আবেদন করলেই তা অনুমোদন হয়ে যাবে এমন নয়, এটা সরকারের ওপর নির্ভর করবে।

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry
Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *