বাংলাদেশের প্রবাসী আয় ধারাবাহিকভাবে কমছে

বেনার নিউজ:

টানা গত পাঁচ মাস ধরে কমছে বাংলাদেশে পাঠানো প্রবাসীদের আয় বা রেমিটেন্স। করোনাভাইরাস মহামারি পরবর্তী এমন পরিস্থিতিরই আশঙ্কা করছিলেন অর্থনীতিবিদেরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সবশেষ হিসাব অনুযায়ী, গত বছর করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে রেকর্ড পরিমাণ রেমিটেন্স এসেছে। কিন্তু এ বছর জুন থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত তা ক্রমাগত কমেছে।

রেমিটেন্সের এই নিম্নমুখী প্রবণতা দেশের অর্থনীতিতে ইতোমধ্যে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে বলে জানান অর্থনীতিবিদেরা। তাঁদের মতে, এভাবে চলতে থাকলে টাকার বিপরীতে ডলার আরও শক্তিশালী হবে, সকল পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাবে।

তবে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী ইমরান আহমদের মতে, আগামী ছয় মাসের মধ্যে প্রবাসী আয় মহামারি-পূর্ব অবস্থায় ফিরে যাবে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, অক্টোবর মাসে ব্যাংকের মাধ্যমে প্রায় ১৬৫ কোটি ডলার রেমিটেন্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা, যা সেপ্টেম্বর মাসের চেয়ে কম। সেপ্টেম্বর মাসে রেমিটেন্স আসে প্রায় ১৭৩ কোটি ডলার।

এর আগে আগস্ট মাসে আসা রেমিটেন্সের পরিমাণ ছিল ১৮১ কোটি ডলার, জুলাইতে ১৮৭ কোটি ও জুনে এসেছিল প্রায় ১৯৩ কোটি ডলার।

২০১৯ সালের শেষের দিকে চীনের উহান থেকে করোনাভাইরাস মহামারি শুরু হলে সেই প্রভাব পড়ে সারা বিশ্বের অর্থনীতিতে।

আমদানি-নির্ভর বাংলাদেশের অর্থনীতি আমদানি মূল্য পরিশোধের জন্য রেমিটেন্সের ওপর নির্ভরশীল।

মহামারির কারণে বাংলাদেশের প্রধান শ্রমবাজার সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো অর্থনৈতিক মন্দার কবলে পড়ে, এ কারণে বাংলাদেশের রেমিটেন্সে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা ছিল।

যদিও গত বছরের জুন থেকে রেমিটেন্সের ব্যাপক উল্লম্ফন দেখা দেয়। ২০২০ সালের ৩০ জুন শেষ হওয়া ২০১৯-২০ অর্থ বছরে দেশে রেমিটেন্স আসে এক হাজার ৮২০ হাজার কোটি ডলার।

এর আগে ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে রেমিটেন্স এসেছিল এক হাজার ৬২৪ কোটি ডলার।

রেমিটেন্সের ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত থাকে ২০২১ সালের মে মাস পর্যন্ত।

রেমিটেন্সের বৃদ্ধি এবং মহামারির কারণে আমদানি খরচ কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের বৈদেশিক রিজার্ভের পরিমাণ ২০২১ সালের আগস্ট মাসে ৪৮ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করে যা দেশের ইতিহাসে রেকর্ড।

‘স্বাভাবিক হয়ে আসবে’

গত পাঁচ মাস ধরে রেমিটেন্স প্রবাহ কমতির দিকে থাকার “যথেষ্ট কারণ আছে,” বলে মঙ্গলবার বেনারকে বলেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী ইমরান আহমদ।

তিনি বলেন, “করোনা মহামারির মধ্যে আমাদের কর্মীরা আগের বছরের মতো বিদেশ যেতে পারেননি। এ ছাড়া, বিদেশ থেকে অনেকে চাকুরি হারিয়ে দেশে চলে আসার আগে সব সম্পদ বৈধ চ্যানেলে দেশে পাঠিয়ে দিয়েছেন। এর ফলে সার্বিকভাবে রেমিটেন্স বেড়েছিল।”

“আমি মনে করি এই ঋণাত্মক ভাব আগামী ছয় মাসের মধ্যে কেটে যাবে। কারণ, এখন যারা বিদেশ যাচ্ছেন তাঁরা নিজেদের টাকা খরচ করে যাচ্ছেন। বিদেশ গিয়ে আয় করে ধার দেনা শোধ দেয়ার পর তাঁরা দেশে টাকা পাঠাবেন। এ জন্য সময় দিতে হবে,” বলেন মন্ত্রী।

রেমিটেন্স যে ২০২১ সালে কমে যাবে সেটি অর্থনীতিবিদরা আগে থেকেই বলে আসছিলেন বলে বেনারকে জানান বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানিত ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান।

তিনি বলেন, “গত বছর করোনা মহামারির মধ্যে কর্মীরা আতঙ্কে পরিবারের কাছে বেশি বেশি পরিমাণ রেমিটেন্স পাঠিয়েছেন। অনেকে কাজ হারিয়ে দেশে ফিরে আসার আগে তাঁদের সকল সম্পদ দেশে আনুষ্ঠানিক মাধ্যমে পাঠিয়ে দিয়েছেন। সে কারণে রেমিটেন্স ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল।”

এছাড়া বৈধ পথে রেমিটেন্স পাঠালে সরকার যে শতকরা দুই শতাংশ প্রণোদনা ঘোষণা করে “সেটির প্রভাবে মানুষ বেশি বেশি রেমিটেন্স আনুষ্ঠানিক মাধ্যমে পাঠিয়েছেন,” মনে করেন তিনি।

“গত কয়েক মাসে রেমিটেন্স কমতির প্রভাব বাজারে ইতোমধ্যে পড়তে শুরু করেছে,” জানিয়ে তিনি বলেন, “টাকার বিপরীতে ডলারের আনুষ্ঠানিক বিনিময় হার বর্তমানে ৮৫ টাকা। খোলা বাজারে এটি ৯২ পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।”

“একদিকে বৈদেশিক মুদ্রা কম আসছে, আবার অন্যদিকে আমদানি বাড়ছে, মানুষ বিদেশে বেড়াতে যাচ্ছে। ফলে ডলারের চাহিদা বাড়ছে, মূল্যমান বাড়ছে,” বলেন তিনি।

বাংলাদেশে রপ্তানির তুলনায় আমদানির পরিমাণ বেশি, আমদানি-রপ্তানির মধ্যেকার যে ঘাটতি “সেটি পূরণ হয় রেমিটেন্স থেকে,” জানিয়ে অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “এভাবে চলতে থাকলে টাকার অবমূল্যায়ন হবে। সকল নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধি পাবে।”

ডলারের একটি বড়ো অংশ হুন্ডিসহ অনানুষ্ঠানিক খাতে” চলে যাওয়াও বৈদেশিক মুদ্রার পরিমাণ কমে আসার আরেকটি কারণ বলে মনে করেন তিনি।

তিনি বলেন, “বিদেশ থেকে টাকা পাঠালে কর্মীরা শতকরা দুই শতাংশ প্রণোদনাসহ এক ডলারের বিপরীতে ৮৭ টাকা পাচ্ছেন। অন্যদিকে হুন্ডি ব্যবসায়ীরা কমপক্ষে ৯০ টাকা দিচ্ছেন। একারণে প্রবাসীদের একটি অংশ হুন্ডির মাধ্যমে দেশে টাকা পাঠাচ্ছেন যার প্রভাব পড়ছে রেমিটেন্স আয়ে।”

তবে “প্রবাসী আয় কমে যাওয়ার তথ্যটি পুরোপুরি সঠিক নয়,” বলে মনে করেন ব্র্যাকের অভিবাসন শাখার প্রধান শরিফুল হাসান।

তাঁর মতে “রেমিটেন্স ২০২০ সালে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে প্রতি বছর বৃদ্ধি পাবে, এমনটি আশা করা সঠিক নয়।”

মঙ্গলবার তিনি বেনারকে বলেন, “২০১৯ সালে বাংলাদেশ থেকে সাত লাখ কর্মী বিদেশ গেছেন। করোনা মহামারির কারণে ২০২০ সালে গেছেন মাত্র দুই লাখ। অর্থাৎ ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে পাঁচ লাখ মানুষ কম বিদেশ গেছেন।”

তিনি বলেন, “আমাদের হিসাবে করোনা মহামারির কারণে বিদেশ থেকে পাঁচ লাখ প্রবাসী দেশে ফিরে এসেছেন। আবার অনেকে দেশে এসে আটকা পড়েছেন।”

এছাড়া মহামারির কারণে উড়োজাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি এবং বিদেশ গিয়ে প্রবাসীদের নিজ খরচে সঙ্গনিরোধে থাকাতে বাধ্য হওয়ার কারণে এসবের প্রভাব “স্বাভাবিকভাবেই রেমিটেন্সের ওপর পড়ছে।”

পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসলে “আগামী বছরের মধ্যে আমাদের রেমিটেন্স প্রবাহও স্বাভাবিক হয়ে আসবে” বলে মনে করেন তিনি।

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry
Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *