প্রবাসী নারী শ্রমিক: নির্যাতন ও মানসিক আঘাত নিয়ে ফিরলেও দেশে নেই সরকারি পুনর্বাসনের ব্যবস্থা

বেনার নিউজ:

সৌদি আরব থেকে নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফেরা নাজমা বেগম (৩৮) কয়েকমাস ধরে প্রায় প্রতি রাতে ধর্ষণের শিকার হতেন। মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে গত বছরের ৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন নাজমা।

“প্রথম দফায় সৌদি আরবে গিয়ে ভালোই ছিলাম। দুই বছর এক মাস পরে দেশে ফিরে আবারও কাজ নিয়ে সৌদি আরব যাই। তবে এবার কাজ জোটে অন্য মালিকের বাসায়,” জানান নাজমা।

“ধর্ষণের আগে কিছু যেন খাওয়াত। আমি কেমন যেন অচেতন হয়ে পড়তাম। এক সময় খুব অসুস্থ হয়ে পড়ি। তখন ওদের কেউ আমার হাতে টিকিট ধরিয়ে এয়ারপোর্টে ফেলে দিয়ে যায়। এরপর কীভাবে যেন দেশে পৌঁছি,” নাজমা তুলে ধরেন নির্যাতনের কাহিনী।

এখন কিছুটা সামলে ওঠা নাজমা খুব আন্তরিক পরিবেশে বেনারের সাথে আলাপকালে বলেন, “নতুন মালিকের বাসায় যাওয়ার কিছুদিন পরে থেকেই খুব মারধর করত। দিনভর কাজ শেষে রাতে ঘুমাতে পারতাম না। প্রতিরাতে একে একে ২-৩ জন পুরুষ এসে নির্যাতন (ধর্ষণ) করত। আপত্তি করলে মারধর করত।”

দেশে ফিরে স্বজনদের সহায়তায় অনেকটা সামলে ওঠা সুনামগঞ্জের নাজমা বলেন, “সেসব দিনগুলোর কথা ভাবলে গা শিউরে ওঠে। এখনো মাঝ রাতে আতঙ্কে ঘুম ভেঙে যায়।”

নাজমার দেবর ছনু মিয়া, যিনি নিজেও একসময় প্রবাসী কর্মী ছিলেন বেনারকে বলেন, “ভাবি প্রথমবার বিদেশ গিয়ে দিন একবার করে বাড়িতে কথা বলত। কিন্তু পরেরবার গিয়ে টানা ১০ মাস যোগাযোগ করেনি। হঠাৎ একদিন কেউ একজন ফোন করে (আরবি ভাষায়) জানায় উনি দেশে যাচ্ছেন।

“খুব হাসিখুশি আর প্রাণবন্ত ছিলেন নাজমা ভাবি। কিন্তু এয়ারপোর্টে থেকে আমরা ফিরিয়ে আনি যেন একটা জিন্দা লাশ। তার মানসিক অবস্থা খুব খারাপ ছিল। নিজের দুই সন্তানকেও চিনতে পারতেন না। শরীরে আঘাতের চিহ্ন। চিকিৎসার পরে এখন একটু ভালো আছেন। কিন্তু আগের মতো স্বাভাবিক নন,” বলেন তিনি।

জর্ডানে গিয়ে এক মালিকের কাছে তিন মাস কাজ করার পরে বাংলাদেশি দালালের খপ্পরে পড়ে যৌনকাজ করতে বাধ্য হন মানিকগঞ্জের কিশোরী রেহানা খাতুন (১৫)। ছয় মাসের সন্তান পেটে নিয়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে দেশে ফেরেন এই কিশোরী মা।

রেহানার সেই সন্তানের বয়স এখন প্রায় তিন বছর। সেই কিশোরী মায়েরও বয়স বেড়েছে। আলাপকালে বেনারকে তিনি বলেন, “বিদেশ গেছিলাম অভাবের সংসারে শান্তি আনবার জন্য। কিন্তু কোনো লাভ তো হইল না, মাঝখান থেকে জীবনটাই শেষ হইয়্যা গেলো।”

“অবিবাহিত মেয়ে পেটে ছয় মাসের বাচ্চা নিয়ে পাগল হয়ে দেশে ফিরলে পরিবারে কী হয় সেটা তো আন্দাজ করতে পারেন,” বলেন রেহানা।

নিজেদের পরিচয় গোপন রাখার অনুরোধ জানিয়ে রেহানার নানী বেনারকে বলেন, “অনেক চেষ্টা করেও এই নাতনীকে আর বিয়ে দিতে পারছি না। মেয়েটার সাথে সাথে এই পরিবারের সকলের মান-সম্মান, ভবিষ্যৎ সব শেষ।”

বাংলাদেশ থেকে যাওয়া প্রবাসী নারীদের বড়ো একটি অংশ এই ধরনের মর্মান্তিক অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যান।

উপরে উল্লেখিত দুই নারীর মতোই বিদেশে কাজ করতে গিয়ে নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরে মানসিক ট্রমায় ভুগছেন অনেকে। দেশে রেমিটেন্স যোদ্ধারা এমন করুণ পরিণতির শিকার হলেও সরকারিভাবে তাঁদের জন্য কোনো পুনর্বাসন কেন্দ্র কিংবা ট্রমা সেন্টার নেই।

এ বছর প্রকাশিত রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্ট রিসার্চ ইউনিট (রামরু)র এক সমীক্ষা মতে, পরিবারের ভাগ্য বদলাতে বিদেশে কাজ করতে গিয়ে কর্মস্থলে ৩৫ শতাংশ নারী কর্মী শারীরিকভাবে ৫২ শতাংশ মানসিকভাবে আর ১১ শতাংশ যৌন নিপীড়নের নির্যাতিত হয়েছেন।

নিয়োগকর্তা ও তাঁর স্ত্রীর হাতে এসব নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। দেশে ফিরে তালাক, অসুস্থতা, সামাজিক কলঙ্কসহ নানা সমস্যার মধ্যে পড়েছেন ২২ ভাগ নারী।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে প্রবাসী কর্মীদের কাছ থেকে বাংলাদেশ ২১.৭৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আয় করেছে, যা জিডিপির ৬.৬ শতাংশ।

বিভিন্ন দেশ থেকে ফিরে আসা অন্তত ২৫ নারী অভিবাসী শ্রমিকের সঙ্গে কথা হয় বেনারনিউজের এই প্রতিবেদকের। তাঁরা সবাই জানান, বিদেশে মর্মান্তিক অভিজ্ঞতার পর তাঁরা এখন চরম কষ্টের মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন।

বেসরকারি উদ্যোগে সাফল্য

কিছু বেসরকারি সংস্থা এমন মর্মান্তিক পরিস্থিতির শিকার হয়ে ফেরত আসা নারীদের জন্য সামাজিক-মানসিক সহায়তার ব্যবস্থা করছে। এই সহায়তা নেওয়া আটজন নারীর সাথে বেনার প্রতিবেদকের কথা হয়। মানসিক সহায়তা পেয়ে প্রত্যেকেই উপকৃত হওয়ার কথা জানান।

লেবাননে গিয়ে গৃহকর্তা কর্তৃক যৌন ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন ফরিদপুরের জোনাকি বেগম (৪০)। বিদেশে থাকাকালে দেশে স্বামীও মারা যান। এমন অবস্থায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়া জোনাকি বেগমকে মনো-সামাজিক কাউন্সেলিংসহ অর্থনৈতিক সহায়তা দেয় বেসরকারি সংস্থা অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রাম (ওকাপ)।

জোনাকি বেনারকে বলেন, “টানা আট মাস মালিক আমাকে নিয়ে খারাপ কাজ করায়। দেশে স্বামীও মারা যায়। দেশে ফিরলেও কীভাবে সন্তানদের মানুষ করব—সেসব দুশ্চিন্তায় অসুস্থ হয়ে পড়লাম।”

“ওকাপ আমাকে কাউন্সেলিং করানোর পাশাপাশি দফায় দফায় চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করিয়েছে। কিছু নগদ অর্থ সহায়তাও দিয়েছে; তা দিয়ে গরু কিনেছি। দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। ছোট মেয়েকে নিয়ে কিছুটা ভালো আছি,” বলেন তিনি।

চলতি বছরের এপ্রিল মাসে প্রকাশিত ওকাপের একটি প্রতিবেদন বলছে, ফরিদপুর, নরসিংদী, মুন্সিগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জের ২৬২ জন ফেরত আসা নারী শ্রমিকের মধ্যে ৬০ শতাংশ বিভিন্ন রকম নির্যাতনের শিকার এবং এদের ১৬ শতাংশই বিদেশে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

পাচার বা নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফেরা নারীদের পুনর্বাসনের জন্য একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে ওকাপ।

সংস্থাটির প্রোগ্রাম কোঅর্ডিনেটর আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, “এমনিতে নারী কর্মীরা সমাজে বাঁকা চোখের শিকার। আর এ ধরনের পরিস্থিতির শিকার হয়ে ফিরলে পরিবারও তাঁদেরকে গ্রহণ করতে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যায়।”

“এমন অবস্থায় নির্যাতনের শিকার হয়ে ফেরত আসা নারী কর্মীদের জন্য পূর্ণাঙ্গ পুনর্বাসন প্রকল্প থাকা উচিত,” বলেন তিনি।

ওকাপ শুধু ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ৬৬ জন নারী ও ২৫ জন পুরুষকে এই ধরনের পুনর্বাসনে সহায়তা করেছে এবং তাঁরা ভালো আছেন বলেও জানান তিনি।

বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের অভিবাসন প্রোগ্রামের প্রধান শরিফুল হাসান বেনারকে বলেন, “সামাজিক এবং আর্থিক দিক থেকে প্রচণ্ড ভালনারেবল নারীরাই একটু ভালো থাকার আশায় বিদেশে যায়। কিন্তু সেটাও যখন হয় না, উপরন্তু নানা ধরনের নিপীড়নের শিকার হয়ে ফেরে তখন আরো ভালনারেবল হয়ে পড়ে। এ অবস্থা্য় তাঁদের মানসিক আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর জন্য মনো-সামাজিক কাউন্সেলিং অত্যন্ত জরুরি।”

ব্র্যাক গত কয়েকবছরে প্রায় পাঁচ হাজার বিদেশ ফেরত কর্মীদের মানসিক সহায়তা দিয়েছে। এই তথ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, “তারা অন্য যেকারো তুলনায় অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়ে সমাজে ফিরেছেন।”

গত চার-পাঁচ বছরে বিদেশ থেকে প্রায় ৬০ হাজারের বেশি নারী বিভিন্ন দেশ থেকে ফেরত এসেছে। এদের মধ্যে কোভিড-১৯ এর কারণে গত বছরেই এসেছে প্রায় ৫০ হাজার প্রবাসী নারী।

শরিফুল হাসান বলেন, “ফেরত আসা নারীদের বড়ো একটি অংশ এসেছে সৌদি আরব থেকে। এদের মধ্যে কতজন তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরেছে—সেটার সঠিক পরিসংখ্যান করা সম্ভব না। তবে আমাদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ফেরত আসাদের এক-তৃতীয়াংশই কোনো না কোনো তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে ফেরত আসে।”

গৃহকর্তা কর্তৃক অন্তঃসত্ত্বা হয়ে দেশে ফেরা এক নারীর মা বেনারকে বলেন, “নিজের সন্তানের এই দুর্দশা দুচোখে দেখতে পারি না। আবার আমাদের অতটা সামর্থ্য নেই তার মনের চিকিৎসা করাব।”

“মেয়েটা একটা ছয় মাসের বাচ্চা কোলে নিয়ে দেশে ফিরল। কিন্তু পরিবার, সন্তানের কথা ভেবে সেই বাচ্চা চিরদিনের মতো অন্যকে দিয়ে আসতে বাধ্য হলো। মায়ের মনের কষ্ট কি এত সহজে দূর যায়?” বলেন তিনি।

বিদেশ থেকে ফেরত আসা এই ভুক্তভোগী মহিলাদের মানসিক ট্রমা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে।

“শরীরের দাগগুলো মিলিয়ে গেছে। কিন্তু মনের দাগ মেটাব কীভাবে বলতে পারেন? স্বাভাবিক কাজকর্মও করতে পারি না,” বলছিলেন সিলেটের নাজমা বেগম।

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) মহাপরিচালক মো. শহীদুল আলম বলেন, “পাচারের শিকার হয়ে বিদেশ থেকে ফেরত নারীদের ট্রমা দূর করতে বিশেষ কোনো ব্যবস্থা হাতে নেয়নি সরকার। তবে একটি পুনর্বাসন প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। যার আওতায় দেশে ফেরত আসা ২ লাখ প্রবাসীকে (নারী ও পুরুষ) ১৩ হাজার টাকা করে সহায়তা দেয়া হবে।”

“৪২৫ কোটি টাকার এই প্রকল্পের ২৭০ কোটি টাকাই বরাদ্দ প্রবাসীদের বিভিন্ন প্রকার প্রশিক্ষণের জন্য। আশা করি এই প্রকল্পের মাধ্যমে বহু প্রবাসী উপকৃত হবেন,” বলেন তিনি।

নোট: প্রবাসী নারীদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার্থে প্রতিবেদনে ভুক্তভোগীদের ছদ্মনাম ব্যবহার করা হয়েছে।

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry
Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *