নতুন রাজনৈতিক দল বিজিপির আত্মপ্রকাশ

বেনার নিউজ:

দেশে প্রধান বিরোধী দলের কার্যকর অনুপস্থিতির মধ্যে মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে মাঠে নেমেছে বাংলাদেশ গণঅধিকার পরিষদ (বিজিপি) নামে একটি নতুন রাজনৈতিক দল, যার মূল স্লোগান ‘জনতার অধিকার, আমাদের অঙ্গীকার’। 

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপির সাথে গাঁটছড়া বেঁধে গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া গণফোরামের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ড. রেজা কিবরিয়াকে আহবায়ক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সর্বশেষ সহ-সভাপতি (ভিপি) নুরুল হক নুরকে সদস্য সচিব করে আত্মপ্রকাশ করেছে ওই দলটি। 

রাজধানীর পুরানা পল্টনে বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদের কার্যালয়ে ওই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, “নুরুরা স্বপ্ন দেখতে জানে, স্বপ্ন বাস্তবায়নও করতে পারে। তারা যদি সঠিক পথে থাকে, তবে পরিবর্তন আসবেই। কারণ তরুণেরাই পরিবর্তন আনতে পারে।” 

বিজিপি যখন আত্মপ্রকাশ করেছে, তখন দেশে কার্যকর বিরোধী দল নেই। জাতীয় সংসদে বিরোধী দল জাতীয় পার্টিকে সরকারের অংশীদার বলে মনে করা হয়। 

অন্যদিকে রাজপথে বিরোধী দল বিএনপির তেমন কর্মসূচি নেই। যদিও মঙ্গলবার রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে। দলটির প্রধান খালেদা জিয়া দুর্নীতির দায়ে সাজাপ্রাপ্ত হয়েছেন, সরকারের অনুমোদন নিয়ে কারাগারের বাইরে অবস্থান করছেন। খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমান লন্ডনে অবস্থান করছেন এবং দুর্নীতির দায়ে তিনিও সাজাপ্রাপ্ত। 

অন্যদিকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ইস্যুতে কোনঠাসা হয়ে পড়া জামায়াতে ইসলামী বাহ্যত অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। এরই মধ্যে নতুন একটি রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ নিয়ে রাজনীতিতে আছে জল্পনা–কল্পনা। 

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা শরীফুজ্জামান শরীফের মতে, নতুন এই সংগঠনের মাধ্যমে বিরোধী দলের শূন্যতা পূরণ হবে বলে মনে হয় না। 

তবে সংগঠনের আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে ড. রেজা জানান, দেশে সুষ্ঠু নির্বাচনী ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনাই হবে তাঁদের প্রথম কাজ। 

“আমরা একটি নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার চাই,” জানিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ‘প্রতারণার নির্বাচন’ আখ্যা দিয়ে ড. রেজা জানান, দলীয় সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচনে অংশ নেবে না তাঁর দল। 

দেশের তিনশ আসনে প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি তাঁদের রয়েছে বলেও জানান তিনি।

“জনগণ সাথে থাকলে কেউ আমাদের ঠেকাতে পারবে না,” বলেন ড. রেজা। 

জনগণের শক্তির ওপর ভরসা করে গণঅধিকার পরিষদ যাত্রা শুরু করেছে উল্লেখ করে তিনি জানান, দেশের সবগুলো রাজনৈতিক দলের সাথে নিজেদের দাবিগুলো নিয়ে তাঁরা আলোচনার করবেন। 

গণঅধিকার পরিষদের ঘোষণাপত্র পাঠ করেন নুর, যেখানে বলা হয়, ৫০ বছরেও দেশে গণতন্ত্র আসেনি। ভোটাধিকার হারিয়ে গেছে। মৌলিক ও মানবাধিকার নেই, অর্থনৈতিক মুক্তিও ঘটেনি। 

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে দেশের একমাত্র সর্বসম্মত ‘সামাজিক চুক্তি’ হিসাবে আখ্যা দেয়া হয় ঘোষণাপত্রে। 

তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার দাবি প্রসঙ্গে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. শান্তনু মজুমদার বেনারকে, “এমন কিছু দাবি করা উচিত নয় যেটা সারা পৃথিবীতে নেই, সেটা খুব একটা সুবিধাজনক দাবি নয়।” 

“আমি যেটা বুঝি যে, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থেকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পরিচালিত একটি প্রশাসনই যথেষ্ট। কারণ রাষ্ট্র এবং সরকারের তফাত আছে। এখানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে চলবে, সেই বিধিবিধানও কিন্তু রয়েছে। সেগুলো যেখানে লঙ্ঘিত হচ্ছে, সেখানে চাপ প্রয়োগটা জরুরি,” বলেন তিনি। 

তাঁর মতে, “আত্মপ্রকাশের উচ্ছ্বাসে একটি নতুন দলের নেতারা অনেক কিছুই বলতে পারেন। তবে তারা কতদূর কী করতে পারবেন, সেটা এখনই বোঝার উপায় নেই।” 

নতুন দলকে নিষিদ্ধ করার দাবি

আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানের দিনই গণঅধিকার পরিষদসহ এর সহযোগী সংগঠনগুলোকে নিষিদ্ধসহ ড. রেজা, নুর ও তাঁদের সহযোগীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে মঙ্গলবার সকালে শাহবাগে বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করে সমাবেশ করেছে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ নামের একটি সংগঠন। 

সংগঠনের সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল ও সাধারণ সম্পাদক মো: আল মামুন বেনারকে জানিয়েছেন, তাঁদের ধারণা সারাদেশে সংগঠিত সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক নৈরাজ্যে রেজা-নুরদের মদদ ছিল। যে কারণে এমন দাবি তুলেছেন তারা।

তবে “যে কারো দল করার অধিকার আছে,” উল্লেখ করে ড. শান্তনু বলেন, “তাদের নিষিদ্ধ করার দাবিটি মোটেই সমুচিত নয়।” 

২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনকারী ছাত্র অধিকার পরিষদের নেতা হিসেবে আলোচনায় আসা নুর ২০১৯ সালে ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হন। 

২০২০ সালে তিনি নতুন একটি রাজনৈতিক দল করার ঘোষণা দেন। এজন্য যুব অধিকার পরিষদ, শ্রমিক অধিকার পরিষদ, প্রবাসী অধিকার পরিষদসহ বেশ কয়েকটি অঙ্গ সংগঠন গঠন করেন। 

ডাকসু নির্বাচনের আগে-পরে তাঁর ওপর ১৩ বার হামলা হয়, মোট ১৮ টি মামলার আসামি তিনি। 

আওয়ামী লীগের ১৯৯৬ সালের সরকারের অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়ার ছেলে ড. রেজা কিবরিয়া ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে গণফোরামে যোগ দেন। ওই নির্বাচনে ঐক্যফ্রন্টের হয়ে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে হবিগঞ্জে প্রার্থীও হন তিনি। 

তাঁর নতুন সংগঠনটি গণচাঁদার টাকায় চলবে জানিয়ে তিনি বলেন, কোনো ব্যবসায়ী মহল বা শিল্পপতির মুখাপেক্ষী থাকবে না এই দল।

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry
Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *