ঢাকায় নতুন এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের কাজ পেয়েছে চীনা দুই কোম্পানি

বেনার নিউজ:

সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে (পিপিপি) বাস্তবায়নাধীন আরেকটি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ পেলো দুই চীনা কোম্পানির সমন্বয়ে গঠিত কনসোর্টিয়াম।

বুধবার অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় চায়না কমিউনিকেশনস কন্সট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড এবং চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ কর্পোরেশনের সমন্বয়ে গঠিত কনসোর্টিয়ামকে সাড়ে ১৩ কিলোমিটার রামপুরা-আমুলিয়া-ডেমরা এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের কাজটি দেয়া হয় বলে সাংবাদিকদের জানান কমিটির সভাপতি ও অর্থমন্ত্রী আ.হ.ম. মুস্তাফা কামাল।

এটিসহ পিপিপি’র আওতায় বাংলাদেশে সড়ক যোগাযোগের তিনটি বড়ো প্রকল্পের সঙ্গে চীনা কোম্পানি যুক্ত হলো।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আওতাধীন সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব কর্তৃপক্ষের মহাপরিচালক মো. আবুল বাশার বেনারকে বলেন, “ঢাকা বাইপাস, প্রথম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং আজকে পাশ হওয়া রামপুরা-আমুলিয়া-ডেমরা (র‌্যাড) প্রকল্পটিও চীনারা করছে।”

রামপুরা-আমুলিয়া-ডেমরা এক্সপ্রেসওয়েটির কাজ আগামী বছর আগস্ট মাসের মধ্যে শুরু হতে পারে বলে বেনারকে জানিয়েছেন সরকারের সড়ক ও জনপথ বিভাগের কর্মকর্তারা।

তাঁরা জানান, পিপিপি প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের জন্য জমি বরাদ্দ সংক্রান্ত সকল খরচ সরকার বহন করবে এবং মূল প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের খরচ যোগাবে চীনা কোম্পানিগুলো। এর বিপরীতে সরকার চীনা কোম্পানিকে কিস্তির মাধ্যমে টাকা শোধ করবে।

তবে রামপুরা-আমুলিয়া-ডেমরা এক্সপ্রেসওয়েটি ঢাকা শহরে যানজট বৃদ্ধি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। যদিও সড়ক ও জনপথ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, এই ধারণা সঠিক নয়। 

প্রতিদিন চলবে ৩০ হাজার যানবাহন

ঢাকার হাতিরঝিল সড়ক প্রগতি সরণির যে স্থানে মিলেছে সেখানে থেকে চট্টগ্রাম রোড পর্যন্ত সাড়ে ১৩ কিলোমিটার এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করা হবে।

এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য হলো, যানজট কমানো। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে, এই দূরত্ব অতিক্রম করতে সর্বোচ্চ ১৫ মিনিট লাগবে, যা এখন অতিক্রম করতে কমপক্ষে এক ঘণ্টা প্রয়োজন হয়।

পিপিপি’র সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের পর থেকে এই সড়কে প্রতিদিন ৩০ হাজার যানবাহন চলাচল করবে। সেই যানবাহনগুলো থেকে আদায় করা হবে টোল।

সড়ক ও জনপথ বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এ.বি.এম. সেরতাজুর রহমান বেনারকে বলেন, “আজকে সরকারের অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে রামপুরা-আমুলিয়া-ডেমরা এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পটি পাশ হয়েছে। এখন আমরা এবছর ডিসেম্বর মাসের মধ্যে চীনা কনসোর্টিয়ামের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করব।”

তিনি বলেন, “চুক্তি অনুযায়ী আগামী বছর আগস্ট মাসের মধ্যে চীনা কনসোর্টিয়ামকে জমি বুঝিয়ে দেওয়া হবে। জমি বুঝিয়ে দেয়ার কাজ সম্পন্ন করতে সরকারের খরচ হবে এক হাজার ২০৯ কোটি টাকা (১৪১ মিলিয়ন ডলারের বেশি)।”

সেরতাজুর রহমান বলেন, “জমি বুঝিয়ে দেয়ার পর তারা কাজ শুরু করবে। সব মিলিয়ে নির্মাণ কাজ শেষ হবে চার বছরে। এক্সপ্রেসওয়েটি নির্মাণ করতে দুই চীনা কোম্পানি ২৫০ মিলিয়ন ডলার খরচ করবে।”

তিনি বলেন, “আমরা ২০১৭ সালে জমিসহ এই প্রকল্পের খরচ ২৬২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার নির্ধারণ করেছিলাম। তবে বর্তমানে ডলারের বিপরীতে বিনিময় হার পরিবর্তনসহ অন্যান্য কারণে সেই খরচ এখন ৩৯১ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে।” 

সেরতাজুর রহমান জানান, নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার পর দুই চীনা কোম্পানি এক্সপ্রেসওয়েটি ২১ বছর রক্ষণাবেক্ষণ করবে এবং টোল আদায় করে সেই টাকা সরকারের কাছে জমা দেবে। বিপরীতে সরকার প্রতি ছয় মাস অন্তর কনসোর্টিয়ামকে ১০৭ কোটি করে ৪২ কিস্তিতে তাদের টাকা পরিশোধ করবে। 

যানজট বাড়বে?

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. এম শামসুল হকের মতে, রামপুরা-আমুলিয়া-ডেমরা এক্সপ্রেসওয়ে ঢাকা শহরের যানজট কমাবে না।

“এই প্রকল্পটি সঠিক পরিকল্পনা করে করা হয়নি,” বলে বুধবার বেনারের কাছে মন্তব্য করেন তিনি।

বর্তমান রাস্তা দিয়ে রামপুরা থেকে ডেমরা যেতে সময় লাগে এক থেকে দেড় ঘণ্টা। তাঁর মতে, এর সাথে রামপুরা-আমুলিয়া-ডেমরা এক্সপ্রেসওয়ে যোগ হলে ওই ১৩ কিলোমিটার রাস্তা সর্বোচ্চ ১৫ মিনিটে অতিক্রম করা গেলেও “সমস্যা হবে অন্য জায়গায়।”

“এক্সপ্রেসওয়ে থেকে যানবাহনগুলো নেমে আসবে সংকীর্ণ মূল সড়কে। ফলে রামপুরার মুখে এবং ডেমরার মুখে তীব্র যানজট দেখা দেবে,” বলেন অধ্যাপক শামসুল বলেন।

তিনি বলেন, “এই এক্সপ্রেসওয়ের সুফল পেতে মূল সড়কের প্রস্থ বৃদ্ধি করতে হবে, যা নিয়ে এখনও চিন্তাভাবনা দেখা যাচ্ছে না।” 

তবে এই আশঙ্কা নাকচ করে সড়ক ও জনপথ বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সেরতাজুর রহমান বলেন, “এক্সপ্রেসওয়ের দুই মুখে যানজটের যে আশঙ্কা করা হচ্ছে সেটি আসলে ঠিক নয়। এক্সপ্রেসওয়েটি ডেমরার পরিবর্তে চট্টগ্রাম রোডের শিমরাইল ইন্টারচেঞ্জ পয়েন্ট পর্যন্ত বর্ধিত করে আট লেন রাস্তার সাথে মিলিয়ে দেয়া হবে।”

“রামপুরার দিকে এক্সপ্রেসওয়েটি রামপুরায় দুটি ইউলুপ আছে সেগুলোর সাথে মিলিয়ে দেয়া হবে। ফলে এখানেও যানজট থাকবে না,” বলেন তিনি। 

অন্য দুই প্রকল্প

সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে নির্মিত হচ্ছে ঢাকা বাইপাস। ঢাকাকে বাইপাস করে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সাথে দক্ষিণ-পূর্ব এলাকাকে সংযুক্ত করাই এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য।

শতকরা ৬০ ভাগ অংশীদারিত্ব নিয়ে চীনা কোম্পানি সিচুয়ান রোড অ্যান্ড ব্রিজ গ্রুপ এবং বাংলাদেশি কোম্পানি শামীম এন্টারপ্রাইজ এবং ইউডিসি কর্পোরেশন যৌথভাবে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে।

সড়কটি গাজীপুর থেকে শুরু হয়ে রূপগঞ্জ-দেবগঞ্জ-ভুলতা-মদনপুর পর্যন্ত চলে যাবে।

বর্তমান মূল্যে ৩৮০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রকল্পটি সম্পন্ন হলে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলাগুলোর যানবাহনগুলো ঢাকা শহরে প্রবেশ না করেই চট্টগ্রাম সিলেটে চলে যেতে পারবে। 

এ ছাড়াও, ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বনানী পর্যন্ত প্রথম ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ কাজটি ইটাল-থাই করার কথা থাকলেও সেটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পেয়েছে চায়না শ্যাংডং ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক অ্যান্ড টেকনিক্যাল কো-অপারেশন গ্রুপ এবং সিনোহাইড্রো কর্পোরেশন।

প্রকল্পটির খরচ এক দশমিক দুই বিলিয়ন ডলার।

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry
Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *