ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন: কিশোরী দীপ্তি ১৩ মাস জেলে, আইনি লড়াইয়ের সামর্থ্য নেই পরিবারের

বেনার নিউজ:

দিনাজপুরের পার্বতীপুর পৌর শহর এলাকার কলেজ ছাত্রী দীপ্তি রানী দাসের মুক্তি প্রত্যাশী স্বজনদের অপেক্ষা ১৩ মাসেও ফুরোয়নি। বরং ক্রমবর্ধমান আর্থিক টানাপোড়েনে ইতিমধ্যে আইনি লড়াইয়ের সক্ষমতা হারিয়েছে তাঁর পরিবার।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে কোরআন শরীফ অবমাননা করে মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগে গত বছরের ২৮ অক্টোবর কিশোরী দীপ্তিকে আটক করে পুলিশ। বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলার বন্দি হিসেবে এক বছরের বেশি সময় পার করা দীপ্তির বাবা দিলীপ কুমার দাস (৪৮) পেশায় ক্ষুদে ব্যবসায়ী।

বেনারকে বৃহস্পতিবার দিলীপ কুমার জানান, “নিম্ন আদালতে দীপ্তির জামিন আবেদন চারবার প্রত্যাখ্যাত হয়। এরপর গত ১১ মে উচ্চ আদালত দীপ্তিকে ছয় মাসের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেয়, যা জেলা প্রশাসকের (ডিসি) আবেদনের প্রেক্ষিতে আবার স্থগিত করে আপিল বিভাগ।”

কেন দীপ্তির জামিন স্থগিতের আপিল করা হয়েছিল জানতে চাইলে দিনাজপুরে ডিসি খালেদ মোহাম্মদ জাকী শুক্রবার বেনারকে বলেন, “এই বিষয়গুলো আরএম (রেভিনিউ মুন্সিখানা) শাখা দেখে। সেখানে খোঁজ না নিয়ে এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু বলতে পারব না।”

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও শালিস কেন্দ্রের (আসক) পরিচালক নীনা গোস্বামী বেনারকে জানান, ডিসির আবেদনের প্রেক্ষিতে আপিল বিভাগে মামলাটি স্পর্শকাতর দাবি করে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী দীপ্তির জামিনের বিরোধিতা করেন। আইনজীবী বলেছিলেন, তাঁকে মুক্তি দেওয়া হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে।

আগামী জানুয়ারিতে আসক আবার তাঁর জামিনের জন্য আবেদন করবে জানিয়ে নীনা বলেন, “বাচ্চা মেয়েটার জন্য খারাপ লাগে। তাঁর বাবা-মা প্রায়ই ফোন করে কান্নাকাটি করেন।”

‘আমরা আসলে নিরুপায়’

“আমরা আসলে নিরুপায়, আমাদের কিছুই করার নেই। রাষ্ট্রপক্ষ কী করবে, সেদিকেই তাকিয়ে আছি,” উল্লেখ করে দিলীপ বলেন, “এই মুহূর্তে মেয়েটার জামিনের জন্য আইনি লড়াই করার মতো টাকা-পয়সাও আমার হাতে নেই। যে কারণে আসকের সহায়তা নিচ্ছি।”

বেনারকে তিনি জানান, গত বছরের ২৮ অক্টোবরের ঘটনার পর থেকে তাঁর হার্ডওয়্যারের ব্যবসা বন্ধ হওয়ার পথে। মেয়ে গ্রেপ্তার হওয়ার পর পরিবারের আর্থিক সক্ষমতা নষ্ট হয়ে গেছে।

রাজশাহীর বায়া এলাকার মহিলা ও শিশু-কিশোরী হেফাজতীদের নিরাপদ আবাসন কেন্দ্রে (সেফহোম) বন্দি অবস্থায় ১৮ বছরে পা দিয়েছে দীপ্তি। তাঁর মা অনিমা রানী দাস (৪৩) বেনারকে বলেন, “আমরা তাঁকে মুক্ত করার জন্য কিছুই করতে পারছি না। এটা যে আমাদের কত বড়ো কষ্ট, তা কী করে বোঝাব?”

বারবার জামিনের চেষ্টা করেও মুক্ত করতে না পারায় দীপ্তির শিক্ষা জীবন থেমে যাওয়া এবং তাঁর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তায় পরিবারের প্রত্যেকেই বিধ্বস্ত জানিয়ে অনিমা দাবি করেন, দীপ্তিকে নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে করতে তাঁর পিতামহ মারা গেছেন।

দীপ্তি গ্রেপ্তার হওয়ার আগেই স্থানীয় মুসুল্লিরা তাদের বাড়িতে হামলা চালায়। বিক্ষুব্ধরা পুলিশের ওপর ইট-পাটকেল নিক্ষেপের পাশাপাশি থানার ফটক ভাঙার চেষ্টা করে এবং সেখানে আগুন ধরিয়ে দেয়। এ ঘটনায় তখন পুলিশের ছয়-সাতজন সদস্য আহত হয়।

ঘটনার পরপরই আরিফুল ইসলাম (৩৩) ও আফনান হিমেল (১৫) নামের দুই হামলাকারীকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ।

“তাদের দেখিনি, চিনিও না। তবে তারা জামিনে মুক্তি পেয়েছে বলে শুনেছি। অথচ আমার মেয়েটার জামিন হলো না,” বলেন দিলীপ। 

দীপ্তির বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার তদন্তের সর্বশেষ অবস্থা বেনারকে জানাতে পারেননি পার্বতীপুর মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সুজয় কুমার রায়।

দীপ্তির বাবা- মা বেনারকে জানান, ‘সেফহোমে’ বন্দি থাকায় মেয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে। তার শারীরিক অবস্থারও অবনতি হয়েছে।

দিলীপ বলেন, “টাকার অভাবে প্রতি মাসে তাকে দেখতে যেতেও পারি না।”

সেফহোমের উপ-তত্ত্বাবধায়ক লাইজু রাজ্জাক শুক্রবার বেনারকে বলেন, “দীপ্তি এখানে ভালোই আছে। এখানে তাঁকে অভিযুক্ত নয়, একজন ‘ভিকটিম’ (আক্রান্ত) হিসেবেই দেখা হয়। বাবা-মায়ের সাথে তাঁকে প্রায়ই ফোনে কথা বলিয়ে দেই।”

তবে এতদিনেও জামিন না হওয়ায় ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা ও পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দীপ্তির মন খারাপ থাকে। ৫০ আসনের ওই সেফহোমে এখন একশজন রয়েছে বলেও বেনারের প্রশ্নের জবাবে জানান লাইজু।

“দীপ্তি পার্বতীপুর সরকারি কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হওয়ার দুই মাসের মধ্যেই এই ঘটনাটি ঘটল। তবুও পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার যথেষ্ট ইচ্ছে এখনো তাঁর রয়েছে,” বলেন দিলীপ।

‘শিক্ষালয়ে থাকা উচিত, বন্দিশালায় নয়’

দীপ্তি ছবি আঁকতে এবং গল্প লিখতে ভালোবাসে উল্লেখ করে লন্ডনভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, গ্রেপ্তারের পর থেকে সে পড়ালেখা চালিয়ে যেতে পারছে না। সংস্থাটির দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ক্যাম্পেইনার সাদ হামাদি বলেছেন, “দীপ্তির শিক্ষালয়ে থাকা উচিত, বন্দিশালায় নয়।”

তাঁর মুক্তির দাবিতে প্রধানমন্ত্রীর গণ আবেদন পাঠাতে গত ২৪ নভেম্বর থেকে সংস্থাটি অনলাইনে চিঠি সংগ্রহ শুরু করেছে, যা ১৯ জানুয়ারি পর্যন্ত চলবে।

“অ্যামনেস্টি আমাদের জানিয়েছে তারা আইনমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছেও চিঠি পাঠাবে,” বলেন দিলীপ।

গত ২৫ নভেম্বর গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে সাদ বলেন, “শুধুমাত্র ‘ফেসবুক পোস্টের’ কারণে একজন কিশোরীকে তাঁর বিকাশের সময়ে সাজা দিয়ে আটকে রাখায় উদ্বিগ্ন না হয়ে উপায় নেই। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো নিবর্তনমূলক আইন কাউকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলতে কতটা কার্যকর, সেটাই এখানে দেখা যাচ্ছে।”

দীপ্তির বিরুদ্ধে আনা ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করা’ এবং ‘আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটানোর’ অভিযোগটি অস্পষ্ট বলেও তারা দাবি করেছে। তাঁর সাত বছর পর্যন্ত জেল হতে পারে উল্লেখ করে সংস্থাটির দেওয়া বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, তাঁর ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে এক মহিলার পায়ের ওপর কোরআনসহ একটি ছবি পোস্ট করা হয়েছিল।

তখন ‘অধরা দীপ্তি’ নামের ওই ‘একাউন্ট হ্যাক’ করা হয়েছিল বলে তাঁর বাবা বেনারকে বলেছেন।

দীপ্তির পরিবারের ভাষ্য, বিভিন্ন সময়ে সংখ্যালঘু সংগঠনগুলোর আশ্বাস পেলেও তাদের পাশে পায়নি তারা।

সংখ্যালঘুদের সবচেয়ে বড়ো সংগঠন হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মনীন্দ্র কুমার নাথ বেনারকে বলেন, “এই অভিযোগ অস্বীকার করার উপায় নেই। সাম্প্রদায়িকতায় আক্রান্তদের সার্বক্ষণিক খোঁজ-খবর রাখার ব্যবস্থা আমরা এখনো গড়ে তুলতে পারিনি।”

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry
Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *