ডাকাত সন্দেহে ছয় ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যার দায়ে ১৩ জনের মৃত্যুদণ্ড

বেনার নিউজ:

এক দশক আগে রাজধানীর অদূরে সাভারের আমিনবাজারে ৬ ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যার দায়ে ১৩ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে ঢাকার একটি আদালত।

বৃহস্পতিবার ঢাকা জেলার দ্বিতীয় অতিরিক্ত দায়রা জজ ইসমত জাহান এ রায় ঘোষণা করেন বলে বেনারকে নিশ্চিত করেছেন রাষ্ট্রপক্ষের মামলা পরিচালনাকারী সরকারি কৌসুলি (পিপি) শাকিলা জিয়াছমিন মিতু।

তিনি জানান, এ মামলার মোট ৬০ আসামির মধ্যে তিনজন বিচার চলাকালে মারা গেছেন ও ১২ জন পলাতক। রায় ঘোষণার সময় কারাগারে থাকা ৪৫ আসামি আদালতে হাজির ছিলেন।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সকলকে ২০ হাজার টাকা করে জরিমানাও করা হয়েছে বলে জানান শাকিলা জিয়াছমিন। অন্য একটি ধারায় এই ১৩ জনকে আরও সাত বছরের কারাদণ্ড এবং ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

রায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পাশাপাশি ১৯ আসামিকে ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অন্য একটি ধারায় তাঁদের ৭ বছরের কারাদণ্ড এবং ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় মামলা থেকে ২৫ জনকে খালাস দিয়েছে আদালত।

ডাকাত সন্দেহে হত্যা

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০১১ সালের ১৭ জুলাই পবিত্র শবে বরাতের রাতে আমিনবাজারের বড়দেশী গ্রামে ঘুরতে গিয়েছিলেন সাত বন্ধু। তাঁরা সবাই ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ছিলেন। রাত সোয়া একটার দিকে স্থানীয় কিছু দুর্বৃত্ত তাঁদের ডাকাত বলে পিটিয়ে ও কুপিয়ে আহত করে। এতে ছয়জন মারা যান আর একজন আহত হন।

হামলায় নিহত ছয় ছাত্র হলেন; শামস রহিম, তৌহিদুর রহমান, ইব্রাহিম খলিল, কামরুজ্জামান, টিপু সুলতান ও সিতাব জাবির। হামলায় প্রাণে বেঁচে যাওয়া ছাত্রের নাম আল-আমিন।

হামলার ঘটনার পরদিন স্থানীয় বালু ব্যবসায়ী আবদুল মালেক বাদী হয়ে সাত ছাত্রের বিরুদ্ধে সাভার থানায় একটি ডাকাতি মামলা করেন।

তবে নিহত ছাত্ররা ডাকাত ছিলেন না তা ওই ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্তে বেরিয়ে আসে। এমনকি হত্যা এড়াতে পুলিশ যথাযথ ভূমিকা পালন করেনি বলেও ওই তদন্তে উঠে আসে। মিথ্যা মামলা দায়েরের অভিযোগে ব্যবসায়ী মালেকের বিরুদ্ধে মামলা করারও নির্দেশ দেয় আদালত।

ছয় ছাত্রকে হত্যার অভিযোগে পুলিশ বাদী হয়ে সাভার থানায় একটি মামলা করে। ওই মামলার তদন্তভার থানা পুলিশের হাত থেকে সিআইডি এবং পরে উচ্চ আদালতের নির্দেশে মামলাটি র‍্যাবের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তদন্ত শেষে ২০১৩ সালের ১৩ জানুয়ারি ৬০ জনের নাম উল্লেখ করে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় র‍্যাব। অভিযোগপত্রে সাক্ষী করা হয় ৯২ জনকে।

অভিযোগপত্রে বলা হয়, আসামিরা নিরীহ ছাত্রদের হত্যার উদ্দেশ্যে মারধর করেন। হত্যার ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে স্থানীয় মসজিদের মাইকে ডাকাত আসার ঘোষণা দেওয়া হয়।

গত ২২ নভেম্বর এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামি পক্ষের যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে ২ ডিসেম্বর রায় ঘোষণার তারিখ ধার্য করে আদালত। সে অনুযায়ী আজ রায় হলো।

রায়ে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া আসামিরা হলেন; আবদুল মালেক, সাইদ মেম্বার, আবদুর রশীদ, ইসমাইল হোসেন, জমশের আলী, মীর হোসেন, মজিবর রহমান, আনোয়ার হোসেন, রজ্জব আলী সোহাগ, আলম, রানা, আবদুল হামিদ ও আসলাম মিয়া।

যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া আসামিরা হলেন; শাহীন আহম্মেদ, ফরিদ খান, রাজীব হোসেন, ওয়াসিম, সাত্তার, সেলিম, মনির হোসেন, আলমগীর, মোবারক হোসেন, অখিল খন্দকার, বশির, রুবেল, নুর ইসলাম, শাহাদাত হোসেন, টুটুল, মাসুদ, মোখলেছ, তোতন ও সাইফুল।

আসামিপক্ষ আপিল করবে

রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে শাকিলা জিয়াছমিন বলেন, নিহত ছাত্রদের পরিবারের সদস্যরা ন্যায় বিচার পেয়েছেন। আশা করি রায় দ্রুত কার্যকর হবে। 

রাষ্ট্রপক্ষের আরেকজন আইনজীবী আব্দুল মতিন সাংবাদিকদের বলেন, “এটি অনেক বড়ো ঘটনার একটি মামলা। দীর্ঘদিন ধরে ধরে আমরা অনেক কষ্ট করে মামলার ৯২ জনের মধ্যে ৫৫ জন সাক্ষীকে আদালতে এনে সাক্ষ্য করিয়েছি। আমরা রায়ে সন্তুষ্ট।”

আমিনবাজারের ঘটনায় নিহত ছাত্র তৌহিদুর রহমান পলাশের বাবা মজিবর রহমান বেনারকে বলেন, “এই রায়ে আমরা সন্তুষ্ট, তবে আইনের ফাঁক গলে যেন আসামিরা বের না হয়ে যায় এবং রায় যেন দ্রুত কার্যকর করা হয়। তাহলেই আমাদের সন্তানদের সাথে হওয়া অন্যায়ের সঠিক বিচার হবে।”

তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় রায় নিয়ে একইভাবে সন্তোষের কথা জানান নিহত ছাত্র কামরুজ্জামানের বাবা আব্দুল কাদের সুরুজ ও নিহত ইব্রাহিম খলিলের বাবা আবু তাহেরও।

তবে এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার কথা জানিয়েছে আসামিপক্ষ।

অন্তত ৩০জন আসামির হয়ে এই মামলা লড়েছেন আইনজীবী শিউলি আক্তার খান। তিনি বেনারকে বলেন, “দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা ন্যায় বিচার পায়নি। আমরা এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করব।”

“এটা একটা গণপিটুনির ঘটনা ছিল। রায়ে তার প্রতিফলন হয়েছে কিনা- সেটা এখনো আমরা জানি না। কারণ, পুরো রায় এখনো হাতে পাইনি। রায় হাতে পাওয়ার পর আমরা আপিলের বিষয়টি নিয়ে এগুবো,” বলেন তিনি।

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry
Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *