গ্রাহকদের সাথে প্রতারণা: ২৩টি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব তলব

বেনার নিউজ:

চীনের ই-কমার্স জায়ান্ট আলিবাবার মালিকানাধীন দারাজ ও প্রিয়শপসহ দেশের ২৩টি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব তলব করেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফইইউ)। এর আগে গ্রাহকদের সাথে প্রতারণার অভিযোগে ৪৯টি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করে সরকার।

২৩টি প্রতিষ্ঠান এবং তাদের কর্মকর্তাদের লেনদেনের হিসাব দিতে সকল ব্যাংককে নির্দেশ দেওয়ার কথা বুধবার বেনারকে নিশ্চিত করেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ও ই-কমার্স বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ কর্তৃক গঠিত কমিটির প্রধান এ.এইচ.এম. সফিকুজ্জামান।

এর আগে, ইভ্যালিসহ ১০টি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব ও লেনদেনের তথ্য সংগ্রহ করেছেন গোয়েন্দারা। সেগুলো হলো; ইভ্যালি, আলেশা মার্ট, কিউকম, ই-অরেঞ্জ, ধামাকা শপিং, সিরাজগঞ্জ শপ, আলাদিনের প্রদীপ, বুমবুম, আদিয়ান মার্ট ও নিডসডটকমবিডি। 

ওই ১০ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কালো তালিকায় যোগ হলো এই ২৩ প্রতিষ্ঠান। ফলে কালো তালিকাভুক্ত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দাঁড়াল ৩৩টিতে। উচ্চ ছাড়ে প্রলোভন দেখিয়ে পণ্য বিক্রি, গ্রাহকের অর্ডার নিয়েও পণ্য সরবরাহ না করাসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে।

কেন এই সিদ্ধান্ত?

অনলাইন পেমেন্ট চালু হওয়ার পর থেকে অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে অনলাইন ভিত্তিক ব্যবসার প্রসার ঘটতে থাকে। করোনা মহামারির মধ্যে এই খাতের ব্যাপক প্রসার ঘটে।

বাংলাদেশের ই-কমার্স খাতে বর্তমানে লেনদেনের পরিমাণ কমপক্ষে ১৬ হাজার কোটি টাকা বা প্রায় প্রায় দুই বিলিয়ন মার্কিন ডলার, ২০২৩ সালে এই খাত তিন বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে জার্মান প্রতিষ্ঠান স্ট্যাটিস্টার এক গবেষণায় উঠে এসেছে।

গবেষণায় জানা গেছে, বাংলাদেশে কমপক্ষে দুই হাজার ই-কমার্স সাইট এবং ৫০ হাজারের বেশি ফেসবুকভিত্তিক ই-কমার্স পেজ রয়েছে।

তবে এ বছর সেপ্টেম্বর মাসে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালির বিভিন্ন অনিয়ম গণমাধ্যমে আসলে সমস্যা শুরু হয়। 

ইভ্যালির অনিয়ম নিয়ে ২৩ সেপ্টেম্বর বাণিজ্য মন্ত্রী টিপু মুনশির সভাপতিত্বে এক আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে টিপু মুনশি সাংবাদিকদের বলেন, ইভ্যালির কাছ থেকে গ্রাহকরা ৭৫০ কোটি টাকা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আরও ২৫০ কোটি টাকা পাবে।

তবে গ্রাহকদের ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে টাকা ফেরত দেবার সামর্থ্য ইভ্যালির নেই বলে জানান তিনি। 

বাংলাদেশ ই-কমার্স জগতে হইচই ফেলে দেয় ইভ্যালি। বিভিন্ন অফারের মাধ্যমে শতকরা ৮০ ভাগ পর্যন্ত ডিসকাউন্ট দিয়ে পণ্য বিক্রি করে আসছিল প্রতিষ্ঠানটি।

ব্যাপক ডিসকাউন্টের কারণে সাধারণ ক্রেতারা হুমড়ি খেয়ে টাকা দেয় ইভ্যালিকে। এক পর্যায়ে এত টাকার বিপরীতে গ্রাহকদের পণ্য সরবরাহে আটকে যায় প্রতিষ্ঠানটি।

পণ্য এবং টাকা কোনোটি না পেয়ে রাস্তায় নামেন গ্রাহকেরা। গত ১৬ সেপ্টেম্বর অর্থ আত্মসাৎ ও চেক জালিয়াতির অভিযোগে ইভ্যালির প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ রাসেল ও তাঁর স্ত্রী এবং ইভ্যালির চেয়ারম্যান শামীমা নাসরিনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এখন তাঁদের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি মামলার কার্যক্রম চলমান। এতে বন্ধ হয়ে যায় ইভ্যালির ব্যবসায়িক কার্যক্রম।

তিন মাস পার হয়ে যায় কিন্তু ইভ্যালি থেকে পণ্য পাই না।

‘মাস পার হয়ে যায় কিন্তু পণ্য পাই না’

ইভ্যালি থেকে সস্তায় পণ্য কিনতে গিয়ে ঠকেছেন ঢাকার মিরপুর এলাকার ব্যবসায়ী সাকিব আহমেদ। 

তিনি বেনারকে বলেন, “শতকরা ৪০ ভাগ ডিসকাউন্টে ১৫০ সিসির ভেসপা কিনতে আমি ৯০ হাজার টাকা ইভ্যালিকে দেই। আমি শুনেছি, তারা মাল সরবরাহ করে দেরিতে। আমি সেটি মেনে নিয়েছিলাম।”

“দেখা গেলো, এক মাস, দুই মাস, তিন মাস পার হয়ে যায় কিন্তু ইভ্যালি থেকে পণ্য পাই না। এর কয়েকদিনের মধ্যেই মিডিয়ায় খবর দেখি ইভ্যালি দেউলিয়া,” বলেন সাকিব।

ইভ্যালির পর আরো অন্তত দশটি প্রতিষ্ঠানের দুই ডজনের বেশি মালিক বা পরিচালককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। 

তবে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের হিসাব তলব করেছে—“এই খবরটি আমাদের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর,” বলে বুধবার বেনারের কাছে মন্তব্য করেন ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সহ-সভাপতি মোহাম্মদ সাহাব উদ্দিন। 

তাঁর মতে, “কোনো প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তাদের কাছে সরকার হিসাব চাইবে, তাতে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু কোনো অভিযোগ ছাড়া এভাবে সকল ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান অথবা ব্যক্তির হিসাব তলব করা সাধারণ মানুষের মধ্যে খারাপ বার্তা দেয়।”

“এই হিসাব তলবের একটি মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে আমাদের ই-কমার্স খাতে। আমরা ইতোমধ্যে একটি বাজে পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। এর মধ্যে এই হিসাব তলবের খবর আমাদের খাতকে সাংঘাতিক ক্ষতি করবে। গ্রাহকদের কাছে আমাদের গ্রহণযোগ্যতা কমে আসবে,” বলেন তিনি।

বাংলাদেশে ই-কমার্স এর বর্তমান বাজার ১৬ হাজার কোটি টাকার মতো (প্রায় দুই বিলিয়ন মার্কিন ডলার)। ২০২৩ সালে এই খাত তিন বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে জানান সাহাব উদ্দিন।

বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা থেকে পাওয়া তিনটি তালিকায় “গ্রাহকের সাথে প্রতারণা করেছে এমন ৪৯ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের নাম ছিল,” বলে বেনারকে জানান অতিরিক্ত সচিব সফিকুজ্জামান।

তিনি বলেন, “গত পহেলা নভেম্বর আমরা কমিটির একটি সভা করে তাদের কালো তালিকাভুক্ত করেছি। সেই তালিকা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটে পাঠানো হয়েছে।”

তিনি জানান, এর পরিপ্রেক্ষিতে দেশের কোন কোন ব্যাংকে “প্রতারণায় জড়িত” ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর হিসাব আছে, তা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট খতিয়ে দেখবে।

“আশা করা যায়, আগামী ৮ নভেম্বর তারা সেই প্রতিবেদন আমাদের কাছে হস্তান্তর করবে এবং পরদিন ৯ নভেম্বর আমরা সভা করে প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেয়া যায় সেই সুপারিশ মন্ত্রিসভায় পাঠাব,” বলেন সফিকুজ্জামান।

“ই-কমার্স নিয়ে গ্রাহকের সাথে যে প্রতারণা হয়েছে সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই,” বলে বুধবার বেনারকে জানান দুর্নীতি দমন কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ও কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের প্রধান গোলাম রহমান।

সন্দেহজনক লেনদেন, মানি লন্ডারিংসহ বিভিন্ন আর্থিক দুর্নীতির ব্যাপারে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট “আইনের আওতায়” দায়িত্ব পালন করছে বলেন জানান তিনি।

তাঁর মতে, “বিএফআইইউ হয়তো কিছু অনিয়ম পেয়েছে, এজন্যই ব্যাংক হিসাব চেয়েছে। এতে রাগান্বিত হওয়ার কিছু নেই।”

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry
Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *