এই স্তূপ ময়লার নাকি দুর্নীতির | মুক্তকথা

এই স্তূপ ময়লার নাকি দুর্নীতির | মুক্তকথা

<![CDATA[

ঢাকা মহানগরে ময়লার স্তূপের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার দুর্গন্ধ। দুর্গন্ধের সূত্রধার ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন।অতিরিক্ত ময়লার স্তূপ হওয়ার কারণ- সিটি কর্পোরেশনের গাড়ির দুই নম্বরি চালকেরা গাড়ি ফেলে নিখোঁজ হওয়ার কারণে। মহানগরের এই সমস্যা হয়তো কেটে যাবে,পথচারীর রুমালও হয়তো শিগগিরই পকেটে ঢুকবে, কিন্তু এই যে দুর্নীতির দুর্গন্ধটা বাতাসে ছড়াল, তা কি সহজে দূর হবে? এই ময়লার স্তূপের সঙ্গে দুর্নীতির সংযোগটা কী তাই ব্যাখ্যার উদ্দেশে এই লেখা। মোটামুটি পরিষ্কার ঢাকাকে কেন দুর্গন্ধের ঢাকা বানানো হলো, তাই দেখা যাক। দেখা যাক দুর্গন্ধটা কি শুধুই ময়লার দুর্গন্ধ নাকি মানবচরিত্রেরও?

দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে, মানবচরিত্রেরই বহিপ্রকাশ এগুলো। দায়িত্বে চরম অবহেলা, দুর্নীতি আর দায়িত্বহীনতাই সাময়িক এই অবস্থা। ময়লার গাড়ির নকল চালকের হাতে নটরডেম কলেজের ছাত্র নাঈমের মৃত্যুর পর জনবিক্ষোভের মুখে সিটি কর্পোরেশনের ঘুম ভাঙে।বহিরাগতদের দিয়ে ময়লার গাড়ি চালানো বন্ধ করার উদ্যোগ নেয় সিটি কর্পোরেশন। তাদের কাজ সঠিক। কিন্তু পরিণতিটা দুর্ভাগ্যজনক।ময়লার গাড়ি চালানোর মতো লোক হাতে নেই তাদের। মাস্টাররুলেও সেই সুযোগ বন্ধ। মানুষ অবাক দৃষ্টিতে দেখতে পায়, ডিএসসিসির ৫৯১টি নিজস্ব গাড়ি চালানোর জন্য চালক রয়েছেন ২২৫ জন। একই অবস্থা ডিএনসিসিরও। তাদের বর্জ্যবাহী গাড়ির সংখ্যা ১৩৭টি আর চালক রয়েছে মাত্র ৪১ জন। এই তথ্য বলে গাড়ির চেয়ে চালকের সংখ্যাল্পতা কতটা। প্রতি গাড়িতে ২ জন চালক এই হিসাব যদি নাও ধরা হয়, অন্তত প্রতি দুই গাড়িতে তিন চালক থাকাটা খুবই জরুরি। সেখানে গাড়ির সমপরিমানও চালক নেই দুই সিটি কর্পোরেশনেরই। প্রশ্ন আসে গাড়িগুলো চলছে কী করে। জবাবও পাওয়া গেছে সংবাদ মাধ্যমে। বর্জ্য সরানোর কাজে এতদিন এইসব গাড়ির অধিকাংশই চলেছে বহিরাগতদের দ্বারা। এবং তারা সবাই অবৈধ চালক। ড্রাইভারই নয় একজনও । ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকার কথা তো পরের বিষয়। সিটি কর্পোরেশনের টনক নড়ার পর সেই নকল চালকেরা উধাও হয়ে গেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, তারা কাজে আসেনি, তাই বলে কি দুর্ঘটনা কমে যাবে? কিংবা হঠাৎ চালকের অধিক স্বল্পতার কারণে কাজের যে ব্যাঘাত সৃষ্টি হলো তাও সামাল দেওয়া হবে কিভাবে? অত্যন্ত স্পর্শকাতর পেশায় নিয়োজিত চালক যে দ্রুত পাওয়া যাবে এমনটাও নয়।

আরও পড়ুন: খুনির হাতে স্টিয়ারিং কেন?

সিটি কর্পোরেশনে গাড়িচালকের ঘাটতির বিষয়টি অনেক পুরনো, তারা ঘাটতি পূরণের ব্যবস্থা নেয়নি কেন? স্বাভাবিকভাবেই এই প্রশ্নটি এসে যায়। জানা যায়- নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়েও তারা প্রয়োজনীয় গাড়িচালক পায়নি। কোন কারণে পায়নি তার ব্যাখ্যা জানা নেই। তবে অবৈধভাবে যারা গাড়ি চালাচ্ছে তাদের মধ্যে যোগ্য কেউ থাকলে তাদের আত্মীকরণের কোনো চেষ্টা কি করা হয়েছিল? কিংবা যাদের দক্ষতা কম কিংবা যাদের কিছু প্রশিক্ষণ দিলে প্রয়োজন মিটিয়ে নেওয়া যেতো, সেই উদ্যোগও কি নেওয়া হয়েছিল? দীর্ঘদিন ধরে গাড়িচালকের ঘাটতি দেখে মনে করা যায়-অবৈধদের অবৈধ রাখার ভাবনাও কাজ করতে পারে। যে কারণে তাদের উন্নত প্রশিক্ষণ দিয়ে কিংবা যাদের যোগ্যতা আছে তাদের আত্মীকরণের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে-সিটি কর্পোরেশনের যে পরিমাণ চালক আছে, তাদের একটি বড় অংশই গাড়ি চালায় না। তাদের কিছু অংশ আছে সংঘ-সমিতির নেতা হিসেবে দাপট খাটিয়ে দায়িত্ব পালন করে না। কিছু আছে অন্যপেশায় নিয়োজিত। কিন্তু সবাই মাস শেষে বেতন নিয়ে যায় সিটি কর্পোরেশনের তহবিল থেকে। আর এই অপেশাদারদের দাপট নতুন কিছু বিষয় নয়। মেধাবী শিক্ষার্থী নাঈমকে যে গাড়িটি চাপা দিয়ে হত্যা করেছে, সেই গাড়ির চালক দীর্ঘ ১০ বছর ধরে গাড়ির স্টিয়ারিংএ বসেননি। করিম মিয়া নামের সেই চালক কাগজে কলমে চালক হলেও মূলত তিনি বই ব্যবসায়ী। ঢাকার নিউমার্কেটে তার বইয়ের দোকান আছে। স্বাভাবিক নিয়মে কোনো কর্মচারী অন্য পেশায় নিয়োজিত হতে পারেন না। সিটি কর্পোরেশনের চাকরি বিধিতেও এর ব্যত্যয় হওয়ার কথা নয়। দীর্ঘ ১০ বছর ধরে তাদের একজন কর্মচারী দায়িত্ব পালন না করে মাসের শেষে বেতন নিয়ে যাচ্ছে-এমন দুর্নীতির খবর কি সিটি কর্পোরেশনের নজরে আসেনি? এক মাস দুই মাস এক বছর দুই বছর হলেও কথা ছিল, দীর্ঘ ১০ বছর ধরে এভাবে নাগরিকের ট্যাক্সের টাকা জলে ঢালা হচ্ছে- এর দায় বহন করবে কে? যদি বলা হয় অগোচরে হচ্ছে, তাহলে স্বীকার করতে হবে, কর্তৃপক্ষের দায়িত্বে অবহেলা আছে। আর যদি বলা হয়, জানাশোনার মধ্যেই তা হচ্ছে-তাহলে বলতে হবে, সেখানে দুর্নীতি কিংবা অদক্ষতা স্পষ্ট। যেকোনোভাবেই হয়ে থাকুক না কেন তারা এর দায় এড়াতে পারবে না।

করিম মিয়ার গাড়িটি চালাতো যে ব্যক্তি সে কি জোর করে সিটি কর্পোরেশনের গাড়ি নিয়ে চালাতো? অবশ্যই এমনটা হওয়ার কথা নয়। শোনা গেছে সেই ব্যক্তি ছিল একজন পরিচ্ছনতা কর্মী। যেমনটা খবর হয়েছে, কোনো ওয়ার্কশপের কর্মীও এখন গাড়ি চালানোর কাজ করছে। 

মহানগর কর্তৃপক্ষের গাড়িগুলোর ৮০ ভাগেরই নাকি ফিটনেস সনদই নেই। নিয়োগপ্রাপ্ত চালকেরা স্টিয়ারিং ধরে না। ভুয়া চালকদের বিষয়ে গণমাধ্যমে হৈচৈ শুরু হওয়ার পর ওরা গাড়ি রেখে পালিয়েছে। যারা এতদিন চাকরি না করেও নিয়মিত টাকা পেয়ে আসছিলেন তাদের নাম পরিচয় প্রকাশ হয়নি আজও।

আরও পড়ুন: নটরডেম শিক্ষার্থী নাঈমের বাড়িতে কামরুল ইসলাম-তাপস

সিটি কর্পোরেশনের গাড়িরই যদি ফিটনেস না থাকে তাহলে সাধারণ মানুষের অবস্থাটা কী হবে। সম্প্রতি জানা গেছে- ঢাকা মহানগরে দুই সিটি কর্পোরেশন হওয়ার সময় যে অর্গানোগ্রাম করা হয়েছে, সেখানেও নাকি প্রয়োজনীয় সংখ্যক গাড়িচালকের পদ রাখা হয়নি। দুই সিটি কর্পোরেশনেই যে অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী লোক নিয়োজিত হয়নি তা তো আগেই বলা হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে অর্গানোগ্রামে যখন প্রয়োজনীয় সংখ্যক পদ নেই সেটাও কি পরিবর্তন করা যায় না? যদি বলা হয় চেষ্টা চলছে তাও জানার কথা- এই চেষ্টার গতি কি কিংবা ফলও বা কি? যত ব্যাখ্যাই দেওয়া হোক না কেন, ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন ভাগ হয়েছে দীর্ঘদিন হয়ে গেছে, আজও  সেই অর্গানোগ্রাম পরিবর্তন করতে পারেনি দুটি প্রতিষ্ঠান।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে- পরিবহন খাতে চরম বিশৃংখলা, দুর্নীতি বিরাজমান। আর সেই দুর্নীতি যে তারাই করছে তাও বলার অপেক্ষা রাখে না। দায়িত্বে অবহেলা হোক আর দুর্নীতি হোক, এই অব্যবস্থাপনা যে নাগরিকের দুর্ভোগ বাড়ায় তাই নয়, জীবনও কেড়ে নেয় তা এবার হাতেনাতে প্রমাণ  হয়ে গেলো। নিশ্চয়ই আমরা আশা করতে পারি, যোগ্য দুই মেয়র আন্তরিকতার সাথে বিষয়গুলো দেখবেন। অন্তত নাগরিকের কাছে যেন সিটি কর্পোরেশন হয়-সেবামূলক প্রতিষ্ঠান, কোনোভাবেই যেন কেউ মনে না করে, এই প্রতিষ্ঠান প্রাণসংহারী কোনো সংস্থা।

]]>

সূত্র: সময় টিভি

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry
Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *