ইউপি নির্বাচনে সহিংসতায় মৃত্যু ৬, হামলার শিকার দুই সাংবাদিক

বেনার নিউজ:

দ্বিতীয় ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে। স্থানীয় পুলিশ, প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, বৃহস্পতিবার নির্বাচনী সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছেন কমপক্ষে ছয়জন, আহতের সংখ্যা শতাধিক।

ভোটে অনিয়মের ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে শরীয়তপুরে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রার্থীর সমর্থকদের হামলার শিকার হয়েছেন দুই সাংবাদিক, তাঁদের একজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে বেনারকে জানায় স্থানীয় পুলিশ।

তবে সহিংসতা এবং প্রাণহানির ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন এবং অপ্রত্যাশিত দাবি করে নির্বাচন কমিশন (ইসি) বলছে, ৮৩৪টি ইউপি নির্বাচন সুষ্ঠু ও উৎসবমুখরভাবে সম্পন্ন হয়েছে।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত নিহত ছয়জনের মধ্যে নরসিংদীতে তিনজন, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা জেলায় একজন করে।

তবে “ভোট খুব সুন্দর হয়েছে, উৎসবমুখর হয়েছে,” দাবি করে নির্বাচন পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে ঢাকায় নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সচিব মো. হুমায়ুন কবীর খোন্দকার বলেছেন, “আজ যে ছয়জন মানুষ মারা গেছেন সেটি নিঃসন্দেহে কমিশনের জন্য দুঃখজনক ব্যাপার।”

এর আগে ২০১৬ সালে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে মোট ৮৪ জন মানুষ মারা গেছেন বলে জানান তিনি।

“ইউপি নির্বাচনে ঘরে ঘরে প্রতিযোগিতা হয়, পাড়ায় পাড়ায় প্রতিযোগিতা হয়। একটি পাড়া আরেকটি পাড়ার ওপর প্রভাব বিস্তার করতে চায়। এই প্রভাব বিস্তার করার একটি প্রতিযোগিতা নির্বাচনে থাকে। প্রার্থী যারা, তাঁরা কিন্তু অতি আবেগি হয়ে যান বিজয়ের জন্য। এসব কারণেই কিন্তু এই নির্বাচনে সহিংসতা হয়ে থাকে,” বলেন সচিব।

এদিকে সচিবালয়ে এক বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বৃহস্পতিবার বলেন, বলেন, “ইউপি নির্বাচন হলো গোষ্ঠী-গোষ্ঠীর নির্বাচন, আধিপত্যের নির্বাচন। এই নির্বাচনে ঝগড়াঝাটি হয়েই থাকে।”

“বেশ কয়েকটি এলাকায় হতাহতের ঘটনা আমরা দেখছি। যারা দোষী, তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে,” যোগ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। 

বেশি সহিংসতা নরসিংদীতে

বৃহস্পতিবার সবচেয়ে বেশি সহিংসতার ঘটনা ঘটে নরসিংদীতে। এই জেলার সহকারী পুলিশ সুপার (রায়পুরা সার্কেল) সত্যজিৎ কুমার স্থানীয়দের বরাত দিয়ে বেনারকে বলেন, বাঁশগাড়ি ইউপিতে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী আশরাফুল হক সরকার ও তার প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থী জাকির হোসেনের মধ্যে চলমান বিরোধের জের ধরে সহিংসতার ঘটনা ঘটে।

তিনি জানান, বুধবার সন্ধ্যায় দুই গ্রুপের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে এবং রাতভর থেমে থেমে সংঘর্ষ চলে। ভোরে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান দুইজন। পরে আরও একজনের মৃত্যু হয়।

দেশের প্রায় সাড়ে চার হাজার ইউপির মধ্যে নির্বাচন উপযোগী প্রায় সাড়ে তিন হাজার ইউপির নির্বাচনের লক্ষ্যে গত মার্চে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে ইসি।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সাত মাসে ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছেন কমপক্ষে ৪০জন। অপর দিকে চলতি নভেম্বরের ৯ তারিখ পর্যন্ত মারা গেছেন আরো ১১জন। বৃহস্পতিবার নিহত ছয়জনসহ নির্বাচনী সহিংসতায় এখন পর্যন্ত প্রাণ হারানো ব্যক্তির সংখ্যা কমপক্ষে ৫৭জন।

“নির্বাচন ঘিরে যে বিপুল পরিমাণ সহিংসতার হচ্ছে তাতে এটা প্রমাণিত হয়ে গেছে যে দেশে নির্বাচনী ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়েছে। এই ব্যবস্থায় দেশে আর কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়,” বেনারকে বলেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার।

“সহিংসতায় নিহতদের অধিকাংশই কিন্তু ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের লোক। কারণ এই নির্বাচনে বিএনপিসহ অধিকাংশ বিরোধী দল অংশ নিচ্ছে না। নিজেদের মধ্যে মারামারিই বলে দেয় ক্ষমতার জন্য কতটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে ক্ষমতাসীন দলের লোকেরা। এই পরিস্থিতিতে কোনো ভাবেই সুষ্ঠু নির্বাচন আশা করা যায় না,” বলেন এই নির্বাচন বিশেষজ্ঞ। 

শেরপুর জেলার চরশেরপুর ইউনিয়নের বামনেরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ইউপি নির্বাচনে ভোট দেবার জন্য নারীদের লাইন। ১১ নভেম্বর ২০২১। [বেনারনিউজ]

বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার হিড়িক

নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, প্রথম ধাপে ১০৪ ও দ্বিতীয় ধাপে ৮১জন মিলিয়ে প্রথম দুই ধাপেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামী লীগ মনোনীত ১৮৫জন চেয়ারম্যান প্রার্থী।

“এই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়া ও নির্বাচনী সহিংসতার ঘটনাই বলে দেয় গত দশ বছরে দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়েছে,” বেনারকে বলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন খান।

তিনি বলেন, দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থাকে ব্যাপকভাবে ঢেলে সাজানোর কোনো বিকল্প নেই। অন্যথায় নির্বাচনী ব্যবস্থার অবশিষ্ট বলে কিছুই থাকবে না।

এদিকে বিরোধী শূন্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নিজ দলের বিদ্রোহী প্রার্থীরাই হয়ে উঠেছে আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী। ইসি ও আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা গেছে, প্রথম দুই ধাপের নির্বাচনে প্রায় ৯০০টি ইউপিতে বিদ্রোহী প্রার্থীদের মোকাবেলা করতে হয়েছে আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থীদের।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ.ফ.ম বাহাউদ্দীন নাছিম বেনারকে বলেন, “স্থানীয় সরকার নির্বাচনে যেসব প্রার্থী দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে প্রার্থী হচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে দল। ইতোমধ্যে অনেকের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।”

“যেসব নেতাকর্মীরা সহিংসতায় জড়াচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে,” যোগ করেন নাছিম।

নির্বাচন কমিশন সচিব জানিয়েছেন, আগামী ২৮ নভেম্বর তৃতীয় ধাপের এবং ২৩ ডিসেম্বর চতুর্থ ধাপের ইউপি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। 

হামলার শিকার সাংবাদিক

শরীয়তপুর সদর উপজেলার তুলাসার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দশরশি এবতেদায়ী মাদ্রাসা কেন্দ্রে প্রকাশ্যে ভোটদানের ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থী জামাল হোসাইনের সমর্থকদের হামলার হয়েছেন ডিবিসির চ্যানেলের শরীয়তপুর প্রতিনিধি বিএম ইস্রাফিল এবং দীপ্ত টিভির জেলা প্রতিনিধি রাজিব হোসেন।

আহতদের মধ্যে বিএম ইশ্রাফিল সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রয়েছেন বলে বেনারকে নিশ্চিত করেছেন স্থানীয় সাংবাদিক এম কাজী নাসির।

তিনি জানান, এই ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ প্রার্থী জামালে বিরুদ্ধে লড়াই করছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও বর্তমান চেয়ারম্যান জাহিদুল ইসলাম।

এই ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে শরীয়তপুর সদরের পালং মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো.আক্তার হোসেন বেনারকে বলেন, “দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকের ওপর হামলার বিষয়টি জানতে পেরেছি। এটি খুবই খারাপ কাজ হয়েছে। হামলার ঘটনায় লিখিত অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry
Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *